বিজয়ের সেই মুহুর্তঃ প্রতিটা বাংলাদেশীর জন্য গর্বের আর বীরত্বের প্রতীক

বিজয়ের সেই মুহুর্তঃ প্রতিটা বাংলাদেশীর জন্য গর্বের আর বীরত্বের প্রতীক
শেয়ার করুন

-PRESET71

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বিকেল ৪.৩১ মিনিট।

রেসকোর্স ময়দানে দখলদার পাকিস্তান আর্মির আত্মসমর্পণ। অথচ অনুপস্থিত ৯ মাস ধরে যুদ্ধ করা মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী। এ নিয়ে অনেক কানাঘুষা, সমালোচনা, গুজব, ষড়যন্ত্র তত্ব চালু আছে। আসুন দেখা যাক, সেদিনের ঘটনা প্রবাহ।

তার আগে আমরা জেনে নেই- ২১ নভেম্বর ১৯৭১, বাংলাদেশ বাহিনী ও ভারতের বাহিনী মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ বাহিনী গঠিত হয়। এদিন থেকে আর মুক্তিবাহিনীর একক গেরিলা যুদ্ধ নয়, চুড়ান্ত জয়ের লক্ষ্যে যৌথ বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ। বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান ও ভারতীয় বাহিনীর প্রধান- দুজনেই মর্যাদায় সমান তবু বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সম্মুখ যুদ্ধের অপারেশনাল কমাণ্ডার নিযুক্ত হন ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ। তাঁর অধীনে পুর্বাঞ্চলীয় কমাণ্ডার ল্যাফটেন্ট জেনারেল অরোরা অধিকৃত বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ নেতৃত্বে। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতে বিমান আক্রমন করলে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথেও ভারতের যুদ্ধ শুরু হয়। সেটা একক ভাবে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ।

১৬ ডিসেম্বর সকাল। কলকাতা। মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর। মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান সেনাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন আব্দুল করিম খন্দকার কিছু কাজ কাজ সেরে ফিরেছেন সকাল বেলা দশটার দিকে। ফিরে দেখেন তাঁর জন্য কিছু লোক অপেক্ষা করছেন। তাঁদের কাছেই জানলেন পাকিস্তানি বাহিনী সেদিন বিকেলে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। সেজন্য ঢাকার রেসকোর্সে একটি ছোট্ট অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান হবে। আর তাঁকেই সে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী তখন সিলেট রনাঙ্গনে। এতো অল্পসময়ে তাঁকে অবগত করার সুযোগ নেই।

প্রতিনিধিদলের জন্য কলকাতার দমদম এয়ারপোর্টে বিশেষ বিমান অপেক্ষা করছিল। তাই খন্দকার চলে গেলেন দমদমে। সঙ্গে ছিলেন জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু ও আরও কয়েকজন। দমদমে পৌঁছে বিমানের সিঁড়িতে উঠবেন—এমন সময় দেখলেন আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্বকারী জেনারেল অরোরা সস্ত্রীক এসেছেন একটি জিপে করে। বয়সে অনেক সিনিয়র। তাই তাঁকে সম্মান দেখিয়ে বিমানের দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন খন্দকার। তাঁকে আগে যেতে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু জেনারেল অরোরা বিমানে উঠলেন না; তাঁর পিঠে হাত দিয়ে বললেন, ”আপনি মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার, আপনিই আগে উঠুন।”

বিমান এলো আগরতলায়। আগরতলা থেকে সাতটি হেলিকপ্টার ঢাকা পৌঁছালো মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর প্রতিনিধিদের নিয়ে। একে খন্দকারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল ছাড়াও আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে উপস্থিত থাকলেন এস ফোর্সের অধিনায়ক মেজর শফিউল্লাহ, কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী, পরাজিত জেনারেল নিয়াজীকে কর্ডন করে নিয়ে গেলেন ২ নং সেক্টরের সহ-অধিনায়ক মেজর হায়দার।

ঢাকায় যখন পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করছে তখন উত্তর-পূর্বের জেলাশহর সিলেটে ঢুকছে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী। ৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছিল সিলেট ঘেরাও। শহরের কেন্দ্রস্থল সার্কিট হাউজ ছেড়ে পাকিস্তান বাহিনী পিছিয়ে জমায়েত হয়েছে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে। সার্কিট হাউসে এসে উপস্থিত হলেন ফার্স্ট বেঙ্গলের মেজর হাফিজ, থার্ড বেঙ্গলের মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর আকবর, ক্যাপ্টেন আনোয়ার, ক্যাপ্টেন মহসীন, ল্যাফটেন্ট নুরুন্নবী সহ মুক্তিবাহিনীর কমাণ্ডারগণ । এখানে জেনারেল ওসমানীকে দেখে তাঁরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- “স্যার আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের বদলে আপনি এখানে কেনো?”। জেনারেল নিরুত্তর। কিছুক্ষন পর বাইরের দিকে উদাস দৃষ্টি মেলে বললেন- “এখানে আসতে পেরেছি সেটাই সৌভাগ্য। ঘন্টাখানেক আগে লুকিয়ে থাকা পাকসেনারা গুলি ছুঁড়ে আমার হেলিকপ্টার ফুটো করে দিয়েছে। পথের মাঝে আমাকে হেলিকপ্টার থেকে জরুরী অবতরন করতে হয়েছে, সঙ্গী কর্ণেল আব্দুর রব আহত হয়েছেন”

দুদিন পর জেনারেল ওসমানী মুজিবনগর সরকারের সদর দফতরে ফিরে আসেন। ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তাঁর অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টির হয়, যা মুজিবনগর সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিল।

জেনারেলের এডিসি তাঁকে এ বিষয়ে রিপোর্ট করেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও অবহিত হওয়ার জন্য তাঁর কক্ষে ডাকেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামকে । নজরুল ইসলাম ধীরস্থির হয়ে জেনারেল ওসমানীকে জানালেন, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তাঁর অনুপস্থিতি এখানে রাজনৈতিক মহলে বিরূপ সমালোচনা সৃষ্টি করেছে।

বৃটিশ এটিকেটে অভ্যস্ত জেনারেল নিজের রাগ সামলে বললেন- “দেখুন, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখ হলো স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে কোনও চেতনা এখনও জন্ম হয়নি।আমাকে নিয়ে রিউমার ছড়ানোর সুযোগটা কোথায়? কোনও সুযোগ নেই। তার অনেক কারণ রয়েছে। নাম্বার ওয়ান- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কবে আত্মসমর্পণ করবে, আমি জানতাম না। আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব এসেছে।

নাম্বার টু- ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, এই সশস্ত্র যুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের অধীনে হলেও যুদ্ধের অপারেটিং পার্টের পুরো কমান্ডে ছিলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল শ্যাম মানেকশ। সত্যি কথা আমি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনও নিয়মিত সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানও নই। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। কারণ, বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী কোনও দেশ নয়। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশকে রিপ্রেজেন্ট করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা। জেনারেল মানেকশ গেলে তার সঙ্গে আমার যাওয়ার প্রশ্ন উঠতো। সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আমার অবস্থান জেনারেল মানেকশের সমান। সেখানে জেনারেল মানেকশের অধীনস্থ আঞ্চলিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার সফরসঙ্গী আমি হতে পারি না। এটা দেমাগের কথা নয়, এটা প্রটোকলের ব্যাপার। প্রটোকল সম্পর্কে আমাদের লোকদের কোনও ধারণা নেই, তাই এত ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি। লোকজনকে বুঝিয়ে বলুন।”

সুত্রঃ

১। স্মৃতিতে ১৬ ডিসেম্বর: ঐতিহাসিক সেই বিকেল। একে খন্দকার। বিডিনিউজ.কম। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩

২। রক্তেভেজা একাত্তর। মেজর(অবঃ)হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। সাহিত্য প্রকাশ।

৩। একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা। নজরুল ইসলাম। অনুপম প্রকাশনী।

 

Visited 14 times, 1 visit(s) today