নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রমহ্রাসমান অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে শিক্ষাখাতেও সংকট গভীর হচ্ছে। অভিভাবকেরা আর মানসম্মত টিউশনের ব্যয় বহন করতে পারছেন না, যার সরাসরি আঘাত পড়েছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর।
বিশেষত যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন-পেশায় যুক্ত ছিলেন, তারা এখন চারদিকে আর্থিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে সারাদেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় শুরু হয়। স্থবির হয়ে পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতি, বন্ধ হয়ে যায় শত শত শিল্প কারখানা। বাড়তে থাকে বেকারত্ব। গাজী গ্রুপ, বেক্সিমকো, গ্লোব শিল্প পরিবারসহ দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান অগ্নিসংযোগ আর লুটপাটে ধ্বংস্ব হয়ে যায়।
বিজিএমইএ আর বিকেএমই’র হিসাব মতে দেশে প্রায় ১৫ লক্ষ লোক চাকরীহীন হয়েছে গত দেড় বছরে। এর আগে ২০২০ সালে করোনার প্রদুর্ভাব কমে আসার পর বিভিন্ন পেশার লোকজন নিজ কর্মস্থলে ফিরে যায়।
তবে অনেকেই যেমন হারিয়েছেন চাকরি তেমনি তৈরী হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের টিউশন সংকট। সেসময় বাধ্য হয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংকট উত্তরণে বাধ্য হচ্ছেন পার্টটাইম চাকরিতে প্রবেশ করতে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। সরকারের অর্থনৈতিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ-আস্থা হ্রাস এবং বেসরকারি খাতের কার্যক্রম কমে গেলে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অর্থনীতির সংকট ও সামাজিক বাস্তবতা
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়েছে, আগের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় ব্যতিক্রমী হ্রাস দেখা গেছে, যা কর্মসংস্থান হ্রাস ও গরীবত্বের সম্ভাব্য বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এদিকে, রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, মূল্যস্ফীতি ও বাণিজ্যে সঙ্কোচনের মতো চিহ্নগুলো দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সরাসরি শিক্ষাব্যয় এবং জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করছে। অভিভাবকদের আয় কমে যাওয়ায় তারা সন্তানদের টিউশনিসহ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে অক্ষম হয়ে পড়ছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবারই এখন বাধ্য হয়ে টিউশনের মতো অতিরিক্ত ব্যয় কাটিয়ে দিতে প্রথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী সজীব হোসেন বলেন, “গত তিন মাস কোনো টিউশন পাইনি। অভিভাবকরা আর টিউশনের ব্যয় বহন করতে পারছেন না; আমাদেরই অনুরোধ করতে হয়।”
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলেন, “আগে ৩টা টিউশন করতাম, এগুলো দিয়েই পড়াশোনা ও নিজের খরচ চলত। এখন মাত্র একটি আছে। পার্ট-টাইম কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছি।”
ব্যাংকে চাকরির প্রস্তুতিতে থাকা শরিফুল হাসান জানান, কোচিং বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তিনি এখন শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে ৬ দিন পার্ট-টাইম কাজ করছেন; তবু আয় প্রায় কোচিংয়ের সমান নয়। পড়াশোনায় সময় মিলছে কম।
এইসব অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষার্থীরাই বর্তমান সংকটের সামান্যতম নিরাপদ জায়গা হারিয়ে ফেলছেন। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও জীবিকা- উভয় সংকটে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। পড়াশোনা, আয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা— এর মধ্যে রাজনৈতিক সংকট। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে পরীক্ষা-ফল, ক্যারিয়ার ও আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও নীতিগত উদ্যোগ জরুরি। স্বল্প আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, জরুরি সহায়তা তহবিল এবং পার্টটাইম কাজের নিরাপদ সুযোগ তৈরি না হলে শিক্ষাখাতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ছাড়া টিউশনি নির্ভর এই শিক্ষার্থীদের সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
