শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে ‘সন্ত্রাসবাদে উস্কানি’ আখ্যায় ভারতীয় দূতের কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নালিশ

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে ‘সন্ত্রাসবাদে উস্কানি’ আখ্যায় ভারতীয় দূতের কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নালিশ
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ও আওয়ামী লীগের ঘোষিত ৩ দিনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর রোববার ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জানমালের নিরাপত্তা বিধান, দ্রব্যমূল্য সহনীয় করা, ড. ইউনূসের পদত্যাগ, রাজনৈতিক অধিকার আদায়, কারাবন্দিদের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৩ দিনের কর্মসূচি দিয়েছে। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন ইউনূস সরকারের প্রশাসন। এতে ভারতের দায় রয়েছে বলে মনে করছে ইউনূস সরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনা ভারতে বসে তাঁর সমর্থকদের ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ লিপ্ত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, যার উদ্দেশ্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করা। সেইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের দ্রুত প্রত্যর্পণের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস হিসাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

ছাত্র সমন্বয়ক থেকে অল্পদিনেই রাজনৈতিক দল খুলে নেতা বনে যাওয়া, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া জুলাই মতাদর্শীদের তথাকথিত ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ’ প্রপঞ্চের প্রচারে এবং তাদের ‘প্রেশারে’ পড়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান বোঝাতে এমন লোক দেখানো নালিশ করেছে বলে মনে করছেন  প্রগতিশীল ধারার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।

শেখ হাসিনা সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া অবৈধ এবং এটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তিনি দেশের সাংবিধানিক সংকট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির কথাও তুলে ধরেছেন। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগে যে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উসকানি’র কথা বলা হয়েছে, তা আওয়ামী লীগের ঘোষিত একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ গত ১০ই ডিসেম্বর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য হ্রাস, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. ইউনূসের পদত্যাগ, শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ‘প্রহসনের রায়’ বাতিল, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, অবৈধ ক্যাঙ্গারু আদালত বাতিল এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

কর্মসূচিতে ১১ই ডিসেম্বর সারাদেশে মশাল মিছিল, ১২ই ডিসেম্বর বিক্ষোভ মিছিল এবং ১৩ই ডিসেম্বর সকাল-সন্ধ্যা লকডাউন পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এসব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল, কোনোরূপ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি- গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে তারই প্রতিফলন মিলেছে। ইউনূস সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যমেও এসব কর্মসূচি কেন্দ্র করে কোনো ধ্বংসাত্মক ঘটনা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের খবর মেলেনি। ঢাকা ও জেলা পর্যায়ে কিছু মশাল মিছিল হয়েছে, কিন্তু কোনো ধ্বংসযজ্ঞ বা সহিংসতার ঘটনা ছিল না।

তবুও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করে নালিশ দিয়েছে ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে।

গত ১৫ মাস ধরে দেশে চলমান খুন-ধর্ষণ, মব সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, রাজনৈতিক সহিংসতা, টার্গেট কিলিংসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ভয়াবহ অবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে, তাকে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ দাবি করে নীবব সমর্থন যুগিয়েছে। অন্যদিকে অপরাধীদের দমন না করে উল্টো মব সন্ত্রাসী ও দুস্কৃতিকারীদের ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে প্রশ্রয় দিয়েছে।

অথচ রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধার, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিনা বিচারে লাখো রাজনৈতিক কর্মীর কারাবাসের প্রতিবাদ, ভুয়া-মিথ্যা মামলায় বিপর্যস্ত এই নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আহুত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যায়িত করে উল্টো এর দায় প্রতিবেশী দেশের ওপর দায় চাপিয়ে দিচ্ছে ইউনূস সরকার।

কূটনৈতিক সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টিকে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন।

সর্বশেষ

বাংলাদেশ যেসব বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে, সেসব বিষয় প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত সরকার। গতকাল সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘১৪ই ডিসেম্বর তারিখের প্রেসনোটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবি ভারত স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে আরও বলেছে, ‘আমরা ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে আমাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছি।’

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ভারত কখনো তার ভূখণ্ডকে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ জনগণের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করতে দেয়নি। আমরা আশা করি যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

Visited 45 times, 1 visit(s) today