শ্বেতা ইরিনা
সাধারণত বাংলাদেশের নামী রাজনীতিবিদদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে মোটা দাগে আমাদের যে ধারণা থাকে তা’হলো পূর্ব প্রজন্মের পরিশ্রম বা অর্জনের ভিত্তিতে অন্যদের তুলনায় খানিকটা ’রূপোর চামচ’ মুখেই এরা জন্ম নেয় এবং প্রবাসে পড়তে গিয়ে ডাক্তার-প্রকৌশলী হয়। কখনো কখনো রাজনীতিবিদও হয়। সাহিত্য বা দর্শণের সাথে তাঁদের খুব একটা সম্পর্ক থাকে বলে প্রমাণ তেমন মেলে না।
অতি সম্প্রতি এক এ্যাক্টিভিস্ট বন্ধুর পাঠানো হোয়াটস এ্যাপে বৃটিশ সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিকীর সাম্প্রতিকতম একটি বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ দেখে আমাকে চমকে যেতে হলো! বাংলাদেশের বিদ্যমান অন্তর্বর্তী সরকার গত আগস্ট থেকেই রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রজেক্টে টিউলিপের জড়িত থাকা এবং মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঘুষ নেবার অভিযোগ তুললেও সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে খোদ রুশ সরকার- স্বয়ং ভ্লাদিমির পুতিন। টিউলিপ সেসময় স্বচ্ছতার প্রশ্নে পদত্যাগও করেছিলেন।
অত:পর ফিরে এসেছেন স্ব-মহিমায়। বর্তমান বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসকে গত জুন মাসে বৃটেন ভ্রমণের সময় ‘হাউস অফ কমেন্স’-এ চায়ের আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন যাতে করে তাঁর বিরুদ্ধে আনা ভিত্তিহীন অভিযোগগুলো সম্পর্কে তাঁরা মুখোমুখি আলোচনা করতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর চা পানের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার নৈতিক স্বচ্ছতা ওপক্ষ থেকে দেখা যায়নি। তা’ হালে আবার সেই একই মামলা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা হলে টিউলিপ একটি সাম্প্রতিক ইন্টারভিউয়ে বলেছেন যে তিনি ও তাঁর আইনজীবী নানা ভাবে চেষ্টা করেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়নকারী বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের সাথে প্রচুর যোগাযোগ করেও সাড়া পাচ্ছেন না। অথচ, মামলা কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে বহাল। হতাশ টিউলিপ বক্তব্যের যে স্থাণে বললেন, “আমি যেন কাফকায়েস্ক দু:স্বপ্নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি!’ সেই জায়গাটায় আমি নড়ে-চড়ে উঠলাম। আরে- এ ত’সাহিত্যপ্রেমী এক রাজনীতিক দেখা যাচ্ছে! মনে হলো, সমলিঙ্গের মানুষ হয়েও টিউলিপের প্রেমেই পড়তে যাচ্ছি। সাহিত্য এই জমানায় আর কে পাঠ করে আজকাল?
বিডি ডাইজেস্টের পাঠকদের জন্য এবার সীমিত পরিসরেই একটু ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাওয়া যাক। গত বছর বা ২০২৪-এর ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্রী এবং নিজ পরিচয়েই বৃটিশ সংসদের ‘হাউস অফ কমন্স’-এ হ্যাম্পস্টিড এবং হাইগেট এলাকা থেকে নির্বাচিত সাংসদ এবং বৃটিশ অর্থমন্ত্রীর অর্থনৈতিক সচিব হিসেবে টিউলিপ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ’দূর্নীতি দমন কমিশন’ রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রজেক্ট-এ জড়িত থেকে ২০১৩ সালে রাশিয়া থেকে ৩.৯ বিলিয়ন ডলার ঘুষ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ আনে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৪-এর ৯ই জুলাই থেকে ২০২৫-এর ১৪ই জানুয়ারি পর্যন্ত মন্ত্রী পদমর্যাদায় কাজ করে, সেই পদ থেকে টিউলিপ পদত্যাগ করেন। উল্লেখ্য যে হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেট এলাকায় তিনি ২০১৫ সাল থেকে একজন সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। তবে, রুশ সরকার কিন্তু বাংলাদেশের দূর্নীতি দমন কমিশন’-এর অভিযোগ এককথায় উড়িয়ে দিলো। এরপর ত’ বৃটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকাকে উদ্ধৃত করে ৮ই জুনের দ্য ডেইলী স্টার’-এই প্রকাশিত হলো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান বা নোবেলজয়ী ডক্টর ইউনুসের প্রতি টিউলিপের খোলাখুলি চায়ের আমন্ত্রণ।
বাংলাদেশে আমার কোন সম্পত্তি বা ব্যবসা নেই। এই দেশকে আমি অন্তর থেকে ভালবাসলেও এদেশে আমি জন্মাইনি, বসবাস করি না বা এখানে আমার কর্মজীবনও গড়িনি,’ বলেছিলেন টিউলিপ।
‘দূদক-কে আমি আবার অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার করতে চাইলেও তাঁরা লন্ডনে আমার আইনজীবীদের সাথে যোগাযোগ করতে অস্বীকার করে এবং ঢাকার কোন এলোমেলো এলাকায় চিঠি-পত্র পাঠাতে থাকে। এই ছায়া তদন্তের প্রতিটি পদক্ষেপ গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে, অথচ আমার আইনজীবী দলের সাথে কোন যোগাযোগই করা হয়নি।’
গত ১৭ই নভেম্বর শেখ হাসিনার তথাকথিত ফাঁসির আদেশের পরে পূর্সাবাচলে প্লট দুর্ণীতির অভিযোগ এনে সাথে সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়েমা ওয়াজেদ পুতুল, রেদোয়ান মুজিব সিদ্দিকী ববি’র সাথে পরিবারের সদস্যদের জন্য প্লট পেতে টিউলিপ সিদ্দিকী প্রভাবিত করছেন এই অভিযোগে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যদের নানা মাত্রার কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গেই পুনরায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে একপর্যায়ে টিউলিপ যখন বলেন যে তিনি যেন এক ‘কাফকায়েস্ক বিচারিক প্রক্রিয়ার ভেতর রয়েছেন,’ তখন সাহিত্য-মনষ্ক এই রাজনীতিক আলাদা ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বাংলাদেশের একটি আদালত ব্রিটিশ সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিকের অনুপস্থিতিতেই ২ বছরের সাজা ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
স্কাই নিউজ, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, দ্য স্ট্যান্ডার্ড, আল-জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো একই সুরে জানিয়েছে রায়টি অত্যন্ত বিতর্কিত, প্রক্রিয়াগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের একটি আদালত ব্রিটিশ এমপিকে অনুপস্থিত অবস্থায় দণ্ড দিলেও মামলার প্রকৃতি, অভিযোগের ভিত্তি এবং প্রমাণের স্বচ্ছতা নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে।‘
টিউলিপ সিদ্দিক বলেছেন, এই পুরো প্রক্রিয়াটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ও হাস্যকর ছিল।‘
পাশাপাশি, তিনি বলেছেন যে পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি বা তার আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি; চার্জশিট বা দায়ের কপি, কোনো বার্তায়ও তার আইনজীবীদের হাতে পৌঁছায়নি। তথ্যসুত্রঃ (https://bddigest.news/news/38806/।
১৯৮২ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণকারী টিউলিপ ঢাকা ভার্সিটির প্রাক্তন অধ্যাপক শফিক আহমেদ সিদ্দিকী ও শেখ রেহানার মেয়ে। তাঁর পরিবারের সাথে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বৃটেনের হ্যাম্পস্টীডে থিতু হন। তিনি ঢাকার ‘স্কলাস্টিকা,’ রয়্যাল স্কুল, হ্যাম্পস্টীড’ এবং ‘মিল হিল স্কুল’-এ পড়া-শোনা করেন। লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে আন্ডার-গ্র্যাড শেষ করে ‘কিংস কলেজ’ থেকে একটি মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ‘রাজনীতি, নীতি ও সরকার’ বিষয়ে দ্বিতীয় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
মাত্র ষোল বছর বয়সে টিউলিপ লেবার পার্টিতে যোগ দেন। তাঁর বাবা এসময় একটি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর কথা বলতে পারেননি; ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এ তখন তাঁর বাবা যে সেবা পেতেন, সেটিই তাঁর ‘লেবার পার্টিতে যোগ দানের কারণ হয়ে দাঁড়ান। প্রাক্তন লেবার মন্ত্রী বারবারা ক্যাসল তাঁর রাজনৈতিক আইকন ও মা শেখ রেহানা এবং খালা শেখ হাসিনাকে ‘দুই খুব দৃঢ় নারীবাদী’ বলে তিনি মনে করেন।
২০১০ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্যামডেন কাউন্সিলে টিউলিপ প্রথম বাংলাদেশী কাউন্সিলর হিসেবে আবির্ভুত হন এবং এখানেই তিনি ২০১৪-র মে মাস পর্যন্ত ‘কালচার এ্যান্ড কম্যুনিটিস’ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীপরিষদ সদস্য হিসেবে কাজ করেন।
২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে টিউলিপ ‘হ্যাম্পস্টীড ও কিলবার্ন’ এলাকা থেকে ৪৪.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ২০১৭ সালে একই এলাকা থেকে ৫৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং ২০১৯ সালেও এখান থেকে জয়ী হন। ২০২৪-এ এই নির্বাচনী এলাকাকে ‘হ্যাম্পস্টীড ও হাইগেট’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হলে এখান থেকেই তিনি ৪৮.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন।
বৃটিশ সংসদে সিরীয় শরণার্থীদের বিষয়ে কথা বলা এবং তদানীন্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে এ বিষয়ে চিঠি লেখা, গাজায় ইজরাইলী আক্রমণ ও ইয়েমেনে সৌদি আক্রমণের বিরুদ্ধে আলোচনা করা, শিশু শ্রম, সমান মজুরি ও প্রতিবন্ধকতা অন্তর্ভুক্তিকরণে’র দাবিও তিনি তোলেন। ২০১৭ সালে কর্মক্ষেত্রগুলোয় নানা জাতি-স্বত্বার কর্মী নিয়োগের জোর দাবি তোলেন। ২০১৫ সালে সংসদে তাঁর প্রথম বক্তৃতা ‘বিবিসি’কর্তৃক আয়োজিত জরিপে সেরা সাত সাংসদের বক্তৃতার অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তিনি সংসদে বিরোধী দল হিসেবে লেবার দলের ’ছায়া মন্ত্রী পরিষদে’র শ্রম মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান।
২০১৩ সালে ক্রিশ্চিয়ান পার্সিকে বিয়ের পর ২০১৯-এ পুত্র জন্মের মাত্র দু’দিন আগে ‘হাউস অফ কমন্স’-এ ব্রেক্সিট বিষয়ক ভোট দানে আসেন। ২০১৬ সালেই অবশ্য তাঁর প্রথম কন্যা সন্তান জন্ম নেয়।
কখনোই নিজের মুসলিম আত্ম-পরিচয়কে অস্বীকার না করা টিউলিপ অবশ্য নিজের ’ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক পরিচয়’কেই বড় বিবেচনা করেন। সিনাগগ বা ইহুদি প্রার্থনাস্থানে নানা অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া টিউলিপ একবার বহির্ভ্রমণ ছেড়ে ফেরার সময় যুক্তরাজ্যের সীমান্ত এলাকায় তাঁর ও তাঁর কন্যার পাসপোর্টের পদবি ভিন্ন হওয়ায় ‘ইউকে বর্ডার কন্ট্রোল’-এর জেরার মুখোমুখি হন যতক্ষণ না আর তাঁর জীবনসঙ্গী এসে উপস্থিত হন। এ ঘটনার পর তিনি বৃটেনের স্ব-রাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে শিশুদের পাসপোর্টে বাবা ও মা- উভয়ের নাম লেখার জন্য চিঠি লেখেন।
পার্সী রাজপুত্র সীয়াবশের অগ্নি-পরীক্ষা ও কুর্দিশ টিউলিপ
ইরাণী কবি ফেরদৌসী রচিত ‘শাহনামেহ’ কাব্যগ্রন্থে রাজপুত্র সীয়াবশ তাঁর তরুণী বিমাতা রুদাবার প্রণয় প্রস্তাবে সাড়া না দিলে, ক্রুদ্ধ সুদাবেহ উল্টো তাঁর বয়সী বর তথা রাজা কায়কায়ুসকে সীয়াবশের বিরুদ্ধে ‘ধর্ষণ প্রচেষ্টা-র অভিযোগ আনে। ক্রুদ্ধ পিতা ছেলেকে তাঁর নিষ্পাপতার প্রমাণ রাখতে অগ্নি-পরীক্ষায় আহ্বান করেন। ইরাণী রাজপুত্র সীয়াবশ ভারতের সীতা’ (উত্তর প্রদেশে ‘সীতা’কে ‘সীয়া’-ই ডাকা হয়)-র মত আগুনে ঝাঁপ দিয়ে তাঁর সাদা পোশাক ও ঘোড়া সুদ্ধ অক্ষত আগুন থেকে বের হন। বৃদ্ধ ও দূর্বলচিত্ত রাজা এরপরও তরুণী স্ত্রীকে শাস্তি ত’দেনই না, উল্টো সীয়াবশকে তাঁর চিরচেনা জন্মভূমি ছাড়তে হয়। তুরাণে আশ্রয় নিয়ে তুরাণী রাজকন্যা ফারাঙ্গিসকে বিয়ে করলেও তুরাণ রাজের দরবারেও তাঁর বৈরী তৈরি হয়। রাতের অন্ধকারে একদিন শয্যাকক্ষে নিদ্রিত অবস্থায় ঘাতকেরা তাঁকে হত্যা করে। নিষ্পাপ সীয়াবশের এই শোকে আজো ইরাণে বসন্তের সময় লাল টকটকে রঙের যে ‘কুর্দিশ টিউলিপ’ ফুল ফোটে, ইরাণীরা তাকে ‘খুনে আসিয়াভুশন (সীয়াবশের রক্ত) নামে ডাকে।
নিষ্পাপ মানুষকে বিনা দোষেও যে অনেক সময় দন্ড পেতে হয়, এই পুরাণ যেন তারই পরিচয়।
তবু প্রতিরোধী টিউলিপ পুনরায় তার পাপড়ি মেলে!
