স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানোয় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসায়

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানোয় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসায়
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের ঘোষণার নামে বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় কাটছাঁট করা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতেই, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনগণের চিকিৎসা সেবা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মূল এডিপির তুলনায় ৬৩.২৭ শতাংশ কমানো হয়েছে। অর্থমূল্যে এই কাটছাঁটের পরিমাণ ৮ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। ফলে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নেমে এসেছে ৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকায়, যেখানে মূল এডিপিতে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। এত বড় মাত্রার বরাদ্দ হ্রাসে চলমান ও পরিকল্পিত স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে সার্বিবভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বরাদ্দ কমানোর কারণ হিসেবে পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সব পর্যায়েই দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়েছে। চিকিৎসাসেবায় দক্ষতা থাকলেও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য খাত পিছিয়ে আছে। বাস্তবায়নের হার কম হওয়ায় এ খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

পরিকল্পনা কমিশনের খসড়া আরএডিপি প্রস্তাবে দেখা যায়, সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০ খাতের মধ্যে চারটি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, সাধারণ জনসেবা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও স্বাস্থ্য খাতসহ বাকি খাতগুলোতে গড়ে ৯.২ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এই প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (এনইসি) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে যেসব অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কার্যক্রম পরিচালিত হতো, সেগুলো গত বছর বন্ধ হয়ে গেছে। বড় অঙ্কের অর্থায়ন না থাকায় সামগ্রিকভাবে বরাদ্দ কম দেখাচ্ছে এবং বাস্তবায়নেও প্রভাব পড়ছে।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিসংখ্যানে। পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার মাত্র ১.১৩ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের ১.৬১ শতাংশ যা সর্বনিম্ন। এর ফলে হাসপাতাল উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় ও জনবল সংক্রান্ত বহু প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। জিডিপির মাত্র ১.১৯ শতাংশ ব্যয় করা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা গ্রহণে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত হলেও বড় অংশ চিকিৎসা নেন না। অসুস্থদের ৫১ শতাংশের বেশি সাধারণ ওষুধের দোকান বা স্বচিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নেন মাত্র ১১.৫ শতাংশ মানুষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দে এই বড় কাটছাঁট চিকিৎসাসেবাকে আরও ব্যয়বহুল ও অপ্রাপ্য করে তুলছে। সরকারি হাসপাতালে সেবার মান ও সুযোগ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসা নিতে, যা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

এই অবস্থায় ইউনূস সরকার স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কাটছাঁট করায় স্বাস্থ্য খাত আরো বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

Visited 36 times, 1 visit(s) today