নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর নিউমার্কেট ও ধানমন্ডি এলাকার প্রতিবেশী তিন কলেজ—ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বহুবর্ষজনিত সংঘর্ষের নিরসনে আজ একটি ‘শান্তি চুক্তি’ হয়েছে। তবে এতে সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়নি, যা নতুন উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা কলেজের অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত এই চুক্তিতে দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা একে অপরকে ফুল ও মিষ্টি দিয়ে বরণ করে নিলেও, সিটি কলেজের অনুপস্থিতি এলাকায় অশান্তির ছায়া ফেলেছে।
নিউমার্কেট থানা পুলিশের উদ্যোগে দুপুর ১২টায় ঢাকা কলেজের শহিদ আ. ন. ম. নজীব উদ্দিন খান খুররম অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক এ. কে. এম. ইলিয়াস, আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ রেজওয়ানুল হকসহ শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা অডিটরিয়ামে প্রবেশ করতেই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা গোলাপ ফুল দিয়ে তাদের বর করে নেয়। ‘ঢাকা কলেজ–আইডিয়াল কলেজ ভাই ভাই, মোদের মধ্যে বিভেদ নাই’—এমন স্লোগানে আকাশ ফাটিয়ে ওঠে হল। চুক্তিতে ভবিষ্যতে কোনো সংঘর্ষ বা উত্তেজনায় না জড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়।
কিন্তু সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা চুক্তিতে অংশ নেয়নি। নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজুল হক বলেন, “আমরা তিন কলেজকেই আহ্বান জানিয়েছিলাম। আইডিয়াল কলেজ এসেছে, কিন্তু সিটি কলেজ আসেনি। আশা করছি, অন্তত এই দুই কলেজের মধ্যে আর সংঘর্ষ হবে না।”
সিটি কলেজের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চুক্তিতে যোগ দিইনি কারণ ঢাকা কলেজের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। তারা আলাদাভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলুক।”
এই তিন প্রতিবেশী কলেজের শিক্ষার্থীরা যেন গ্যাং বা কাল্টের মতো একে অপরের সঙ্গে পরপর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এদের মধ্যে ঘটে যাওয়া প্রধান সংঘর্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১৯ জানুয়ারি ২০২৫: সায়েন্স ল্যাবের এক কোচিং সেন্টারে সিঁড়িতে ‘ধাক্কাধাক্কির ঘটনা’কে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়ায়। একজন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আহত হন। পুলিশ মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫: সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সকাল থেকে উত্তেজনা শুরু হয়ে দুপুরে পূর্ণাঙ্গ সংঘর্ষে রূপ নেয়। আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থীকে ছুরি মেরে আহত করা হয়। মোট ১৮ জন আহত হন, সায়েন্স ল্যাব মোড় অচল হয়।
১৫ এপ্রিল ২০২৫: ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব ফুটওভার ব্রিজের নিচে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে সংঘর্ষ করে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে। একাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
২২ এপ্রিল ২০২৫: আবার ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে সিটি কলেজে হামলা চালিয়ে সংঘর্ষ শুরু। ১০০-এর বেশি শিক্ষার্থী আহত হন, পুলিশের ২০ জনও আহত। এটি চার মাসে পঞ্চম সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪: ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাবে সংঘর্ষে জড়ায়, ১৮ জন আহত হন।
২০ নভেম্বর ২০২৪: ঢাকা কলেজের প্রতিষ্ঠা বর্ষক্ষেপে সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা দুটি বাস ভাঙচুর করে, যা সংঘর্ষের সূত্রপাত করে। মিরপুর রোড অচল হয়।
১৯ অক্টোবর ২০২৫: আইডি কার্ড ছিনতাই ও মারধরকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়ায়।
২১ আগস্ট ২০২৫: আইডি কার্ড কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা দফায় দফায় সংঘর্ষ করে। পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে লাঠিচার্জ করে।
২০ আগস্ট ২০২৫: ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাবে সংঘর্ষে জড়ায়, ৮০ শিক্ষার্থী ও দুই শিক্ষক আহত হন। আইডিয়াল কলেজের সাইনবোর্ড ভাঙচুর করা হয়, এইচএসসি বিভাগে দুদিন ছুটি ঘোষণা করা হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, অক্টোবর ২০২৪ থেকে এই তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০০-এর বেশি সংঘর্ষ ঘটেছে, যা নিউমার্কেট-সায়েন্স ল্যাব এলাকায় যানজট ও ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হয়েছে। এসব সংঘর্ষের পেছনে তুচ্ছ কারণ যেমন ধাক্কাধাক্কি, আইডি কার্ড ছিনতাই, কোচিং সেন্টারে বসার ব্যবস্থা বা এমনকি মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে, এসব সংঘর্ষে কলেজ প্রশাসনের কোনো প্রভাব কাজ করছে না। শিক্ষক ও প্রিন্সিপালদের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা পুলিশের মধ্যস্থতাই মেনে নেয়। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস বলেন, “আমরা শিক্ষক হিসেবে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করি, কিন্তু ছাত্ররা শোনে না। এটা যেন গ্যাং ওয়ারের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ রেজওয়ানুল হক বলেন, “প্রতিবেশী কলেজ হওয়ায় ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে, কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।”
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এসব কলেজগুলো যেন ‘কার্টেল’ বা ‘গ্যাং’-এর মতো পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ করে, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যস্থতায় শান্তি চুক্তি হয়। কিন্তু চুক্তি মেনে চলা হয় না, ফলে সংঘর্ষগুলো চক্রাকারে চলতে থাকে।
ডিএমপি রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, “আমরা নিয়মিত বৈঠক করি, কিন্তু ছাত্রদের উপর প্রশাসনের শাসনের অভাব এসব ঘটনা বাড়াচ্ছে। শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”এই চুক্তির পরও সিটি কলেজের সঙ্গে আলোচনা চলবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অন্যথায়, সায়েন্স ল্যাব এলাকা আবার অশান্তির শিকার হতে পারে।
