নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছর পার হলেও দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নিয়ে আসেনি।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারি শেয়ার অফলোড, বড় দেশীয় কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা এবং ব্যাংকঋণের বিকল্প হিসেবে বন্ড বা শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহের যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তার বাস্তবায়ন এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং এই সময়ের মধ্যে বাজারে লেনদেন কমেছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেমে এসেছে, আর নতুন কোম্পানির শেয়ারের যোগান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
বাজার–সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই পুঁজিবাজার স্থবির হয়ে পড়েছে। কথায় সংস্কার, বাস্তবে স্থবিরতা— এমন চিত্র এখন পুরো বাজারে।
একজন শীর্ষ মার্চেন্ট ব্যাংকার বলেন, “বর্তমান কমিশন যেন সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখে। নতুন আবেদন দিলে অনুমোদন পাবে কি না, তা নিয়ে এত অনিশ্চয়তা যে কেউ ঝুঁকি নিতে চাইছে না।”
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দায়িত্ব নেন সাবেক ব্যাংকার খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি বাজার সংস্কারের নামে আগের এক ডজনেরও বেশি কোম্পানির আইপিও আবেদন বাতিল করেন। সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাজার।
মার্চেন্ট ব্যাংকারদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তই বাজারে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। কেউ নতুন আবেদন জমা দিচ্ছে না, ফলে গত ১৭ মাসে কোনো কোম্পানিই মূলধন উত্তোলনের অনুমতি পায়নি।
একইভাবে, ১৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনার সরকারি পরিকল্পনাও থমকে আছে। প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের বৈঠকে দেওয়া নির্দেশনা অনুসারে সরকার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে থাকা সরকারি শেয়ার অফলোডের কথা বললেও তা বাস্তবায়নে কোনো গতি দেখা যায়নি। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসির আওতাধীন বহু প্রতিষ্ঠানে সরকারের মালিকানা থাকলেও, সেই শেয়ার বাজারে ছাড়ার পদক্ষেপও কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।
বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান নিজেও স্বীকার করেছেন, “কেউ ভালো সাড়া দিচ্ছে, কেউ দিচ্ছে না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী শুধু বলেছেন, “কাজ চলছে।” কিন্তু বাস্তবে সেই কাজের কোনো ফলাফল নেই। নতুন আইপিও অনুমোদন নেই, সরকারি কোম্পানি বাজারে আসছে না, বেসরকারি খাতের আগ্রহও নেই। বিএসইসি এখনো ‘পাবলিক ইস্যু রুলস’ সংশোধনের খসড়াও প্রকাশ করেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) দাবি করেছে, ভালো কোম্পানিগুলোকে দ্রুত তালিকাভুক্ত করার জন্য ‘গ্রিন চ্যানেল’ চালু করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই চ্যানেল দিয়ে কোনো কোম্পানি প্রবেশ করেনি। মার্চেন্ট ব্যাংকারদের মতে, এমন উদ্যোগ কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানির (বিএপিএলসি) সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের আইপিও প্রক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ ও জটিল।
“অন্যান্য দেশে ছয় থেকে আট মাসে যেখানে মূলধন তোলা যায়, বাংলাদেশে লাগে দুই বছর। এত দীর্ঘ প্রক্রিয়া আর জটিল বাধ্যবাধকতা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে,” বলেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে গতি ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু পুঁজিবাজারে সেই গতি নেই। নতুন শেয়ার না আসায় বিনিয়োগের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়েছে, বাজারে টার্নওভার কমছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী অন্তর্বর্তী সরকারের নীতির সমালোচনা করে বলেন, “মূলধন উত্তোলন না হলে পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে ড্রাই হয়ে পড়বে। নতুন কোম্পানি না এলে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে না। সরকারের নীতি অস্পষ্ট, আর এই অনিশ্চয়তা দূর না হলে কেউ ঝুঁকি নেবে না।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭–০৮ সালে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২৬টি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, তিতাস গ্যাসসহ বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি তখন বাজারে আসে। ওই সময়ের উদ্যোগেই গ্রামীণফোন তালিকাভুক্ত হয়, যা এখনো দেশের সবচেয়ে বড় মূলধনী কোম্পানি। কিন্তু ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এমন একটি কোম্পানিও তালিকাভুক্ত হয়নি।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংস্কারের নামে অচলাবস্থা তৈরি করে ইউনূস প্রশাসন আসলে বাজারকে আরও দুর্বল করে ফেলেছে। সরকারি শেয়ার অফলোড বা বড় কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ মুখে থাকলেও বাস্তবায়ন নেই। ফলে বাজারে এখন শেয়ারের নয়, আস্থার খরা চলছে।
অর্থনীতি গতি পাচ্ছে, কিন্তু পুঁজিবাজার স্থবির— এই বৈপরীত্যের দায় এখন সম্পূর্ণভাবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর পড়ছে। বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সম্পর্কের অবিশ্বাস, সিদ্ধান্তহীনতা ও নীতিগত দোদুল্যমানতায় দেশের পুঁজিবাজার এখন এমন এক গভীর খরায় পড়েছে, যেখানে শুধু নতুন শেয়ার নয়, ভবিষ্যতের আশাও বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
