বিশেষ প্রতিবেদক
ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্যের ফেসবুক পোস্টে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য ও গুজবের কারণে বাংলাদেশে আবারও অস্থিরতার ছায়া দেখা দিয়েছে। গতকাল মধ্যরাতে তার এক পোস্টে সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের বিরুদ্ধে ক্যু-এর চেষ্টার গুজব ছড়ানো হয়েছে। গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা ছাত্রদের রাস্তায় নামিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি করার চেষ্টা করেন এই ইউটিউবার।
এটি গত বছরের জুলাই দাঙ্গার মাধ্যমে সৃষ্ট সহিংসতার পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চাইছেন পিনাকী, এমনটা মনে করছেন অনেকেই।
২৪ লাখ ফলোয়ারযুক্ত পিনাকী ভট্টাচার্যের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেড রাতের আঁধারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গোপন অভিযান চালাচ্ছে।
পোস্টে দাবি করা হয় সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের সৈন্যরা গভীর রাতে ক্ষমতা দখলের জন্য ক্যু-এর চেষ্টা করছে। এমন তথ্য ছড়িয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ করার ডাক দেওয়া হয়। ফেসবুক পোস্ট ও ভিডিওয়ে বলা হয় ছাত্ররা যেন সতর্ক হয় এবং বেরিয়ে এসে যেন প্রতিরোধ করে।
এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উস্কানিমূলক বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পিনাকির ফেসবুক পোস্টটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে গেছে চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং সিলেটের কয়েকটি এলাকায় মাদ্রাসা ছাত্রদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা রাত জেগে রাস্তায় নেমে আসে এবং সেনা ক্যাম্পের দিকে হামলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়।
স্থানীয় সূত্র অনুসারে, চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসায় ছাত্ররা পোস্টটি দেখে বেরিয়ে এসে স্লোগান দিয়ে পিকেটিং শুরু করে সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে।
মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থী বলেন, “ফেসবুকে দেখলাম সেনারা আসছে আমাদের আক্রমণ করতে। আমরা প্রস্তুত হয়ে গেছি।”
কিন্তু সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এমন কোনো অভিযান চলছে না। এটি স্পষ্ট উস্কানি, যা দেশের অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সংঘাত সৃষ্টি করতে চায়। পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা উচ্চ সতর্কতায় থাকায় এখনও বড় সংঘর্ষ ঘটেনি, তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত, জানান তিনি।
পিনাকী ভট্টাচার্যের এই ধরনের অপপ্রচার নতুন নয়। গত বছর জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের উস্কানি দিয়ে সহিংসতায় যুক্ত করার পেছনে অন্যতম দায়ী করা হয় তাকে। তিনি ‘ভারতবিরোধী’ ধুয়া তুলে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং জনগণকে উস্কে তোলেন। যার ফলে একাধিক স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এমনকি ভারতীয় ও ইসরায়েলি পণ্য বয়কটের নামে তার উস্কানিতে দেশি-বিদেশি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এসব সহিংসতার প্রেক্ষিতে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যবসাও বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির সঙ্গেও অতি ঘনিষ্ঠতা রয়েছে পিনাকীর। তাদের কর্মীদের দিয়ে দেশে নাশকতা, হত্যাযজ্ঞ চালানোর ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল জুলাই-আগস্টে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গতকালের পোস্টটি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার ছাত্রদের মিশিয়ে নতুন করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের সহিংসতা যেভাবে ছড়িয়েছিল, ঠিক তেমনি এখন ধর্মীয় উপাদান যোগ করে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। এটি দেশকে পিছিয়ে নিয়ে যাবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন এই ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা প্রচার দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এমন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় নেতারা এই উস্কানির নিন্দা জানিয়েছে ইতিমধ্যে।
ছাত্রদলের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “আমরা শান্তি চাই, সংঘাত নয়। এমন গুজব ছড়িয়ে দেশের রাজিনীতিকে কুলষিত করছে কিছু বিদেশে থাকা ষড়যন্ত্রকারীরা আর দেশের মানুষকে অরাজকতার মাঝে ফেলছে।”
কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের দায়িত্বশীল একজন মাওলানা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা ছাত্রদের শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছি। মিথ্যা খবরের ভিত্তিতে কোনো অ্যাকশন নেওয়া উচিত নয়।”
ঢাকার একটি বড় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক এই মাওলানা আরও বলেন, “পিনাকী নির্দিষ্টভাবে কেন মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে রাস্তায় নামতে বলছে, নিশ্চয় এর পেছনে দূরভিসন্ধি রয়েছে। সে কি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাদ্রাসার ছাত্রদের লেলিয়ে দিয়ে তাদের হত্যার পরিকল্পনা করছে? এতে কাদের লাভ? সে কি ভারতের পক্ষে কাজ করছে গোপনে, দেশের শান্তি নষ্ট করার জন্য? সময় এসেছে পর্যালোচনা করার।”
একইসাথে তিনি দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পিনাকীর ইউটিউব ভিডিও প্রচার নিষিদ্ধ করারও দাবি জানান।

