নিজস্ব প্রতিবেদক
একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন ‘মঞ্চ ৭১’- এর আয়োজিত অনুষ্ঠানে উত্তেজনার ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীসহ ৬ জনকে ছাত্র-জনতা নামে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ‘পরিকল্পিত মব’ করে তাদের আটক করে গতকাল। পরে তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ‘বাক-স্বাধীনতা হরণ’ ও ‘মব সন্ত্রাস’ ও ‘ফ্যাসিবাদী আক্রমণ’ বলে সমালোচনা করেছে সাংবাদিক নেতা ও সাধারণ সদস্যরা।
ক্রাইম রিপোর্টাস অব বাংলাদেশ(ক্রাব)-এর আন্তর্জাতিক সম্পাদক হাবিবুল্লাহ মিজান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ডিআরইউতে মব সন্ত্রাস মানে—গণতন্ত্রের মুখে চপেটাঘাত। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) আমাদের পেশাদার সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠন। অথচ সেখানেই আজ মব সন্ত্রাস চালানো হলো—ডিআরইউ’র একজন সদস্য হিসেবে আমি গভীরভাবে লজ্জিত। আমি স্পষ্ট করে বলছি, এটাও ফ্যাসিবাদ’।
আয়োজকদের বাক-স্বাধীনতার পক্ষে আছেন জানিয়ে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি তাদের মতের সঙ্গে একমত নই— কিন্তু নিঃশর্তভাবে তাদের মত প্রকাশের অধিকার রক্ষায় আমি আছি’।
ডিআরইউ সদস্য ও ক্রাবের সাবেক অর্থ সম্পাদক শেখ কলিমুল্লাহ লিখেছেন, এটা কলঙ্ক, ডিআরইউ’তে এরকম ঘটনা কোনদিন ঘটেনি।
ডিআরইউ সদস্য মোরসালিন মিজান লিখেছেন, ‘ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ভেতরে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা এর আগে কোনদিন ঘটতে আমরা দেখিনি। আজ ঘটেছে। আমরা অনুমান করছি, ঘটনাটি ঘটতে দেয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের গোলটেবিল ভণ্ডুল করা হয়েছে। আয়োজক মুক্তিযোদ্ধাদের অপদস্থ করা হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রিপোর্টার্স ইউনিটি সহযোগীর ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু আজকের ঘটনায় রিপোর্টার্স ইউনিটিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই দায় বর্তমান কার্যকরী কমিটির’।
‘সংগঠনের সভাপতি নয়া দিগন্তের আবু সালেহ আকন এবং সাধারণ সম্পাদক ইনকিলাবের সাংবাদিক মাইনুল হাসান সোহেলকে জবাবদিহি করতে হবে। নিজ সংগঠনের মিলনায়তনের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা তারা কেন রক্ষা করতে পারলেন না? সংগঠনের সীমানার ভেতরে সন্ত্রাসীরা কী করে ঢুকতে পারল? কী করে মিলনায়তনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লম্বা সময় ধরে তান্ডব চালাতে পারল? উত্তর দিতে হবে’, বলে লিখেছেন এ সিনিয়র সাংবাদিক।
ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল দুইজনের জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সাথে জড়িত। জামায়াতের পত্রিকা দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান অপরাধ প্রতিবেদক আবু সালেহ আকন ও হেফাজতে ইসলামীর পত্রিকা দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক মাইনুল হাসান সোহেল এ ঘটনায় কোন পদক্ষেপই নেননি।
এদিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে দুপুর ১২টার দিকে এ ঘটনায় আটককৃত অন্য দুজন হলেন- অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন, সাংবাদিক মুনজুরুল ইসলাম পান্না। তবে বাকি ৩ জনের নাম পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় আটক সাংবাদিক মুনজুরুল ইসলাম পান্না ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সকালে মঞ্চ’৭১ আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। এক পর্যায়ে সেখানে হামলা করা হয়। অনুষ্ঠানস্থল থেকে আমাকে এবং অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনকে ডিবি অফিসে আনা হয়েছে’।
সেখানে ‘জুলাইযোদ্ধা’ পরিচয়ে আল আমিন রাসেলের নেতৃত্বে কয়েকজন গিয়ে উপস্থিত লোকজনদের ঘেরাও করেন। সেগুনবাগিচা ওয়ার্ড বিএনপির নেতাকর্মীদেরও সেখানে দেখা যায়।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রশিবিরের নেতা শাকিব আহমদের নেতৃত্বে একদল শিবির কর্মী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনের গায়ে হাত তুলেছে।
ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব দেওয়া শাকিব মৌলভীবাজার কুলাউড়া উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তার সাথে কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক সাদিক কায়েম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি এসএম ফরহাদের সাথে ছাত্রশিবিরের অনুষ্ঠানে একাধিক ছবি দেখা গিয়েছে।
একাধিক ভিডিও’তে দেখা গিয়েছে, আওয়ামী লীগ আখ্যা দিয়ে ‘মঞ্চ ৭১’-এর সেমিনারে মব সৃষ্টি করে লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনের গায়ে হাত তুলেছে ও মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্থা করেছে।
এর আগে ছাত্রশিবিরের নেতা শাকিব আহমদের ধানমন্ডি ৩২ ভাঙ্গায়ও নেতৃত্ব দিছে।
অনুষ্ঠানে হেনস্থার শিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা বলেন, “আমি এখানে প্রোগ্রামে এসেছি। দল মতের হিসাবে নয়, এখানে সব মুক্তিযোদ্ধাদের ডাকা হয়েছে; তাই এসেছি। আমরা প্রোগ্রাম শুরু করেছিলাম। লতিফ সিদ্দিকী সাহেব এসেছেন। কামাল হোসেন সাহেব আসেননি। ২০/২৫ জন ছেলে এসে হট্টগোল করে। আমাদের ঘিরে ফেলে।”
লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে যাওয়ার সময় শাহবাগ থানার এসআই রাশেদ বলেন, “এখন তো এখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা নিয়ে যাচ্ছি। পরে সিনিয়ররা সিদ্ধান্ত নেবেন।”
শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মনসুর বলেন, “আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না, এডিসি স্যার উপস্থিত ছিলেন। আমার জানা মতে, ৬/৭ জনকে ডিবি অফিসে নেওয়া হয়েছে।”
অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মিলনায়তনের একটি টেবিল ভাঙা। কয়েকজন অংশগ্রহণকারী আছেন। বেশ কিছু লোক হৈ-হুল্লোড় করছেন।
রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, “লতিফ সিদ্দিকীসহ কয়েকজনকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে; মূলত উনাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এখন সিনিয়রদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।”
অনুষ্ঠানস্থলে কেশব রঞ্জব সরকার নামের একজন মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর রিপোর্টাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মারধরের শিকার হয়েছেন জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল্লাহিল কাইয়ূম।
আয়োজকদের একজন বলেন, “উনাকে বিএনপির লোকজন মারধর করেছে, পরে শাহবাগ থানার দিকে নিয়ে গেছে।”
উত্তেজনার সময় আব্দুল্লাহিল কাইয়ূম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অবস্থান করছিলেন। দুপুর পৌনে দুইটার দিকে বের হয়ে যাওয়ার সময় তোপখানা রোডের বৈশাখী হোটেলের সামনে পথরোধ করে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী।
ঘটনাস্থলে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ সঙ্গে আসা পল্টন থানা জামায়াতে ইসলামীর নেতা শামীম হোসাইন বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি করে চব্বিশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
