নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২৫।
রাজধানীসহ সারা দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও চাপে ফেলেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১৫ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম এখন ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি, যেখানে গত ৩১ জুলাই এই দাম ছিল ৫৫ টাকা। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোক্তাদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, পেঁয়াজের মৌসুম শেষ হওয়া, আমদানি বন্ধ এবং টানা বৃষ্টির কারণে সরবরাহে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, যা দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। তবে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এই অজুহাতকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে। তারা বলছে, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন ৮৫ টাকা ছুঁয়েছে। একইভাবে, পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে দাম আরও বেশি, কোথাও কোথাও ৯০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে সবজি ও ডিমের দামও বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফার্মের মুরগির ডিমের দাম এক সপ্তাহে ডজনে ১২০-১২৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫-১৪০ টাকা হয়েছে।
ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ভলান্টারি কনজিউমারস ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির প্রতিনিধি মো. খলিলুর রহমান বলেন, “এই সময়ে পেঁয়াজ ও ডিমের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ ও নিয়মিত তদারকির অভাবই এই নৈরাজ্যের মূল কারণ।”
এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পেঁয়াজের আমদানি সচল করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। গত ২১ মে মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম নিয়ন্ত্রক জানান, আমদানি বাড়িয়ে বাজার স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। তবে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ ধরনের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, বর্ষা ও বন্যার মৌসুমে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ২০২৫ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ১৮.৭% থেকে বেড়ে ২২.৯% হতে পারে, যা প্রায় ৩০ লাখ মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি তাদের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। রামপুরার এক ক্রেতা সুরুজ আলী বলেন, “দুই কেজি পেঁয়াজ ১২০ টাকায় কিনেছিলাম, এখন ১৬০ টাকা। খরচ বাড়ছে, কিন্তু আয় বাড়ছে না। এভাবে চললে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা কঠিন।”
বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কঠোর অবস্থান ও সিন্ডিকেট ভাঙার কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই নৈরাজ্য থামানো কঠিন। নিয়মিত বাজার তদারকি, আমদানি ব্যবস্থার উন্নতি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। অন্যথায়, পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য একটি নিয়মিত আতঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে।
পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের তৎপরতা ও স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। জনগণের স্বস্তি নিশ্চিত করতে বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব কমাতে হবে এবং আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে।
