নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম ক্লাবের গেস্ট হাউজের ৩০৮ নম্বর ভিআইপি কক্ষ থেকে সাবেক সেনাপ্রধান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এম হারুন-অর-রশীদ বীর প্রতীকের (৭৫) মরদেহ উদ্ধার ঘিরে দানা বেঁধেছে রহস্য।
আজ ৪ঠা আগস্ট, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে পুলিশ বারান্দার গ্লাসের দরজা ভেঙে কক্ষে ঢুকে মরদেহ উদ্ধার করে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার সন্তান হলেও ঢাকায় বসবাসরত ছিলেন সাবেক এই সেনাপ্রধান। তিনি ৩রা আগস্ট, রোববার বিকেলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসেন এবং বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম ক্লাবের ভিআইপি কক্ষে ওঠেন। রাতে একটি বিয়ের দাওয়াতে অংশ নেন এবং রাত পৌনে ১১টার দিকে ক্লাবে ফিরে আসেন।
পরদিন সকালে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ছিল। কিন্তু সকাল ১০টা পেরিয়ে গেলেও কক্ষ থেকে বের না হওয়ায় তার আর্মি প্রটোকল টিমের সন্দেহ হয়। মোবাইল ফোনেও বারবার যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে স্বজন ও ক্লাবের কর্মীদের সহায়তায় বারান্দার কাচের দরজা ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করা হয়। বিছানায় পড়ে থাকা অবস্থায় তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার মো. আলমগীর হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে এটি স্ট্রোক বলে মনে হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। মরদেহে কোনো বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন নেই বলেও জানান তিনি।
এদিকে নিহতের পরিবার এ নিয়ে মুখ না খুললেও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন, সাবেক সেনাপ্রধানের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। ঘনিষ্ঠরদের দাবি, বিষয়টি পরিকল্পিত হতে পারে।
সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান জানান, মরদেহ পরীক্ষা করতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) চট্টগ্রামের একটি মেডিকেল টিম ক্লাবে যায়। তারা দেহে কোনো দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন খুঁজে পাননি।
চট্টগ্রাম ক্লাব লিমিটেডের সেক্রেটারি অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, “সকালে উনাকে নিতে সেনাবাহিনীর গাড়ি এসেছিল। তাকে ফোনে না পেয়ে আমাদের জানানো হয়। তখন আমরা পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে উনাকে বিছানায় শোয়া অবস্থায় পাই।”
তবে সাবেক এই সেনাপ্রধানের মৃত্যুর কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল করিম বলেন, সিএমএইচ-এর টিম সাবেক সেনাপ্রধানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। প্রাথমিকভাবে এটি স্বাভাবিক মৃত্যু বলে তারা জানিয়েছেন।
সাবেক সেনাপ্রধানের নিকটাত্মীয় এনাম আহমেদ জানান, হারুন-অর-রশীদের চট্টগ্রামে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি মামলায় হাজিরা দেওয়া। ক্লাবে তিনি একাই অবস্থান করছিলেন।
১৯৪৮ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া হারুন-অর-রশীদের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারীর ধলই ইউনিয়নে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর প্রতীক খেতাব দেয়।
২০০০ সালের ২৪শে ডিসেম্বর থেকে ২০০২ সালের ১৬ই জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর সরকার তাকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজির রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও দিয়েছিল। তিনি আলোচিত ডেসটিনি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেই সূত্রে একাধিক মামলায় জড়িয়ে পড়ে কারাবরণ করেন।
এদিকে, এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে এখন পুলিশ অপেক্ষা করছে ময়নাতদন্ত রিপোর্টের। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোরালো আলোচনা—স্বাভাবিক মৃত্যু না কি নিখুঁত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? তদন্তের দিকে তাকিয়ে পুরো দেশ।
