নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ৩০ জুলাই ২০২৫।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মো. মোবারক হোসেনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে তাকে খালাস দিয়েছে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ বুধবার (৩০ জুলাই) এই রায় ঘোষণা করে। এই রায়ের মাধ্যমে মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় বাতিল হয়েছে।[]
মামলার পটভূমি
মোবারক হোসেন, যিনি ২০১২ সাল পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন, তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। তার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে দুটি প্রমাণিত হয়, যার একটিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপরটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে বলা হয়, মোবারক হোসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাজাকার বাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, নির্যাতন ও লুণ্ঠনের মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন।
আপিল প্রক্রিয়া
ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে মোবারক হোসেন আপিল করেন। চলতি বছরের ৮ জুলাই তার আপিলের শুনানি শুরু হয় এবং ২২ জুলাই শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায়ের জন্য ৩০ জুলাই দিন নির্ধারণ করে। মোবারকের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক, এবং প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। শুনানির সময় আপিল বিভাগ অভিযোগের প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং আইনি দিকগুলো বিশ্লেষণ করে।
আপিল বিভাগের রায়
৩০ জুলাই প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ মোবারক হোসেনের আপিল মঞ্জুর করে তাকে খালাস দেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে, রায়ের বিস্তারিত তথ্য এখনো সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়নি, এবং আদালতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
এই রায় নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ, আবার কেউ কেউ এই রায়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থক মহল। এই রায়ের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দুইজন সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীকে খালাস দেওয়া হলো, যা যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার গতিপথ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দেশের সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগের রায়, ডিক্রি, আদেশ বা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তির এখতিয়ার রাখে। সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আপিল বিভাগ এ ধরনের মামলায় চূড়ান্ত রায় প্রদান করে। মোবারক হোসেনের মামলায় আপিল বিভাগের এই রায়ও সংবিধানের এই এখতিয়ারের আলোকে দেওয়া হয়েছে।
মোবারক হোসেনের খালাসের রায় যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি একদিকে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হলেও, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে এই খালাসের আইনি ভিত্তি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
