চবি প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতারের কার্যালয়ে তাকে ঘিরে দাঁড়ানো উগ্রপন্থী শিক্ষার্থীরা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে করছেন তর্কাতর্কি। এ সময় কয়েকজন উগ্রবাদী শিক্ষার্থী তাকে শাসিয়ে বলেন, ‘আপনি নিজ যোগ্যতায় বসেননি (উপাচার্য পদে), আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’
আজ সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এমন দৃশ্যের এক ভিডিও।
জানা গেছে, চবির সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তীর পদোন্নতি প্রতিহত করতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে উপাচার্যের কার্যালয়ে গুপ্ত সংগঠন শিবিরসহ উগ্রবাদী কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা হট্টগোল করেন। ভিডিওটি সেই সময় কেউ একজন মুঠোফোনে ধারণ করেন।
গতকাল সহ. অধ্যাপক কুশল বরণকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

উপাচার্য কার্যালয়ের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, দুই উগ্রপন্থী শিক্ষার্থী ঔদ্ধত্যপূর্ণ স্বরে কথা বলেছেন। তাদের একজন চবির গুপ্ত সংগঠন শিবিরের নেতা শাখাওয়াত হোসেন ও আরেকজন ছাত্র অধিকার পরিষদে অনুপ্রবেশকারী শিবির নেতা ও ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী তাহসান হাবীব।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সহ. অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তীর পদোন্নতির সাক্ষাৎকার ছিল গতকাল। এই সাক্ষাৎকার বাতিল ও তাকে আওয়ামী লীগের দোসর, ইসকনের এজেন্ট আখ্যা দিয়ে চাকরিচ্যুতির দাবিতে দুপুর থেকেই প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতের গুপ্ত সন্ত্রাসী সংগঠন শিবির এবং উগ্রবাদী সংগঠন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (ইআবা) এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
এসময় গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক খান তালাত মাহমুদও ছিলেন সেখানে। এরপর বিকেল ৩টার দিকে উপাচার্য কার্যালয়ে যান তারা। উগ্রবাদীদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষকদের সাথে, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সামনে এভাবে কথা বলতে পারেন কি না, প্রশ্ন উঠেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, তাহসান হাবীব উপাচার্যকে বলছেন, ‘আপনাকে আমরা বসিয়েছি (উপাচার্য পদে)। আপনি আমাদের কথা মানতে বাধ্য।’ এরপর উপাচার্য বলেন, ‘না’ । উপাচার্যের জবাবের সঙ্গে সঙ্গেই উগ্রবাদীরা হইচই শুরু করেন। গুপ্ত সংগঠন শিবিরের নেতা শাখাওয়াত তখন উপাচার্যকে বলেন, ‘এখানে আপনি নিজ যোগ্যতায় বসেননি।’ তখন তাহসানও বলেন, ‘আপনাকে আমরা এনে এখানে বসিয়েছি। আপনি নিজ যোগ্যতায় বসেননি।’ তখন উপাচার্য বললেন, ‘কী করেছি আমি?’ তাহসান বললেন, ‘আপনি কেন ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্রমোশন দিচ্ছেন, আমাদের বিপ্লবের সঙ্গে বেইমানি করে?’

সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তী
উপাচার্যের কক্ষে এভাবে উগ্রবাদী শিক্ষার্থীদের তর্কাতর্কি চলছিল, কয়েকজনকে রীতিমত আঙুল উঁচিয়ে শাসাতেও দেখা গেছে। একপর্যায়ে উপাচার্য উপস্থিত সাংবাদিকদের মুঠোফোনের ক্যামেরা বন্ধ করতে বলেন।
এই বাদানুবাদ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপাচার্যের যোগ্যতা নেই, আপনারা পদে বসিয়েছেন- এ কথার ব্যাখ্যা চাইলে গুপ্ত সংগঠন শিবির নেতা শাখাওয়াত বলেন, ‘অতি উত্তেজনায় বলে ফেলেছি। ভেবেচিন্তে বলিনি কথাটা।’
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী তাহসান হাবীব পূর্বে ছাত্র অধিকার পরিষদে যুক্ত থাকলেও এখন আর নেই বলে জানান সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক তামজিদ উদ্দিন বলেন, অন্য একটি সংগঠন দ্বারা প্রভাবিত থাকায় সংগঠন থেকে তাহসানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, তাহসান শিবির কর্মী, ছাত্র অধিকার পরিষদে অনুপ্রবেশ করেছিল, তারা টের পেয়ে সংগঠন থেকে বের করে দিয়েছে।
গত ৫ই আগস্টের পর উগ্রবাদী সংগঠনের কর্মীরা তৎকালীন প্রশাসনকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে। এরপরই একই দিনে পদত্যাগ করেন উপাচার্য, দুই সহ-উপাচার্য, ছাত্র উপদেষ্টা, পরিবহন দপ্তরের প্রশাসক, প্রক্টরিয়াল বডির ১০ সদস্য ও ১৪টি হলের প্রাধ্যক্ষ।
পরে নিজেদের মতাদর্শের অনুসারী নতুন উপাচার্যের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ও কমপ্লিট শাটডাউনের ডাকও দেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুসারে উপাচার্য নিয়োগ হওয়ার কথা সিনেটের মাধ্যমে। তবে সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
