নিজস্ব প্রতিবেদক
জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার দায়ে মালয়েশিয়া থেকে ফেরত পাঠানো তিন বাংলাদেশিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। শুক্রবার তারা বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) তাদের হেফাজতে নেয়।
এটিইউ’র ভারপ্রাপ্ত প্রধান, ডিআইজি আক্কাস উদ্দিন ভূঁইয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “এই তিনজনকে ‘৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার’ দেখিয়ে শুক্রবার আদালতে হাজির করা হয়েছে। আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
উল্লেখ্য, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুযায়ী, পুলিশ যদি কোনো ব্যক্তিকে কোনো আমলযোগ্য অপরাধে জড়িত বলে সন্দেহ করে বা তার কাছে এমন বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে, তবে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে—এ ক্ষেত্রে পরোয়ানার প্রয়োজন হয় না।
এই তিনজনের বিরুদ্ধে আগে বাংলাদেশে কোনো অপরাধের অভিযোগ ছিল কি না—এমন প্রশ্নে ডিআইজি আক্কাস বলেন, “আমরা সেগুলো যাচাই করছি, ওদের তো কেবল পাঠানো হয়েছে। ওখানে যে ৩৬ জনকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে মালয়েশিয়ার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, তাদের মধ্যে ৫ জনকে তারা অভিযুক্ত করেছে। কয়েকজনের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং বাকিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। দেশে ফেরত পাঠানোদের মধ্যেই এই তিনজন রয়েছে।”
তবে ফেরত পাঠানো তিনজনের নাম-পরিচয় এখনো প্রকাশ করেনি পুলিশ।
মালয়েশিয়ার পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ৩৬ বাংলাদেশির একটি চক্র সিরিয়া ও বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর সেলগুলোতে অর্থ পাঠাত।
সে দেশের পুলিশপ্রধান মোহাম্মদ খালিদ ইসমাইল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক অভিযানে এদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা মূলত শিল্প, নির্মাণ ও সেবা খাতে কর্মরত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ও সদস্য নিয়োগের অভিযোগ
মালয়েশিয়ার পুলিশ জানায়, এই চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার করছিল এবং অন্য বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে থেকে সদস্য সংগ্রহ করছিল। তারা আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস ও ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে সিরিয়া ও বাংলাদেশে আইএসের কার্যক্রমে অর্থ পাঠাত বলে জানায় পুলিশ।
মালয়েশিয়ার পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশন অর্থ সংগ্রহের প্রমাণও পেয়েছে। তবে ঠিক কত টাকা পাঠানো হয়েছে তা এখনো তদন্তাধীন। পুলিশের ধারণা, সদস্য ফি ও চাঁদা থেকেই অর্থ সংগ্রহ হতো।
মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য স্টার জানায়, এই চক্র “গেরাকান মিলিটান র্যাডিকাল বাংলাদেশ” বা “জিএমআরবি” নামে পরিচিত। তারা হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম প্ল্যাটফর্মে সদস্য সংগ্রহ ও মতাদর্শ প্রচার করছিল।
পুলিশপ্রধান খালিদ ইসমাইল জানান, “আমাদের ধারণা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাদের সদস্য সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ জনের মধ্যে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, প্রত্যেক সদস্যকে বছরে ৫০০ রিংগিত ফি দিতে হতো। তবে অনুদান সদস্যদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবর্তিত হতো।”
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে এই চক্রের কোনো সংযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এখনো তদন্ত চলছে।”
তিনি আরও জানান, “আমরা অন্যান্য দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ইন্টারপোলের সঙ্গে সমন্বয় করে এই নেটওয়ার্ক উন্মোচনে কাজ করছি।”
গ্রেপ্তার ৩৬ জনের মধ্যে ৫ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। ১৫ জনকে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং বাকি ১৬ জন এখনো মালয়েশিয়ান পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। তদন্ত শেষে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উদ্বেগ ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসিউশন ইসমাইল ২৭শে জুন প্রথম গণমাধ্যমে ৩৬ বাংলাদেশিকে জঙ্গি সন্দেহে আটকের খবর জানান।
তিনি বলেন, “এই দলটি আইএসের মতাদর্শ মালয়েশিয়ায় ছড়িয়ে দিতে চাইছিল এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে অর্থ সংগ্রহ ও সদস্য নিয়োগ করছিল। এমনকি তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করা।”
গত ৩রা জুলাই, বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, “তাদের সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে আটক করা হয়েছে, আমরা মালয়েশিয়ার কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়েছি। আশা করছি, দুই-চারদিনের মধ্যে বুঝতে পারব প্রকৃত চিত্র।”
তিনি আরও বলেন, “বেশ কিছুকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সম্পৃক্ততা যাচাই করবে।”
এই ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশিদের বিদেশে ভিসা প্রাপ্তি প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “যেকোনো নেতিবাচক বিষয় ভিসার ওপর প্রভাব ফেলে। তবে আমরা যদি যথাযথ পদক্ষেপ নিই, তাহলে তা হ্রাস করা সম্ভব।”
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, “আমাদের করণীয় হলো দেখতে হবে তারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না। জড়িত হলে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, সে লক্ষ্যে সচেষ্ট থাকতে হবে।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন তৎপরভাবে যাচাই-বাছাই করছে ফেরত আসা ব্যক্তিদের পটভূমি ও কার্যক্রম। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
