মৃণ্ময় সেন
ঢাকা, ৫ জুলাই ২০২৫: তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম স্বীকার করেছেন যে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানে বিদেশি শক্তির সহযোগিতা ও সাহায্য ছিল। তিনি তার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পিত প্রকৃতি এবং এর দুটি ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মাহফুজ আলম তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন, “৩ তারিখের ১ দফা ঘোষণার আগে জাতিসংঘের বক্তব্য ছাড়া বিদেশি শক্তি বা সামরিক বাহিনী কারোরই বিন্দুমাত্র অংশগ্রহণ ছিল না এ গণ-অভ্যুত্থানে।” তবে তিনি এও বলেন, “ভারতের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে আগরতলা বৈঠক থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য শেখ মুজিব ও অন্য জাতীয় নেতৃত্বের প্রতি যদি আমাদের শ্রদ্ধা থাকে, তাহলে কোনো বিদেশি শক্তির সঙ্গে সলা-পরামর্শ ছাড়াই জনগণের অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলার জন্য অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দকে কেন গালি শুনতে হবে?” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিদেশি শক্তির সঙ্গে পরামর্শের বিষয়টিকে ন্যায্য বলে ইঙ্গিত করেছেন।
তিনি আরও জানান, জুলাই অভ্যুত্থান দুটি ধাপে বিভক্ত ছিল। প্রথম ধাপে, ৫ জুন থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত, আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও নেতৃত্ব তৈরি করা হয়েছিল, যা তিনি “মেটিকুলাসলি ডিজাইনড” বা সুনির্দিষ্টভাবে পরিকল্পিত বলে বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় ধাপে, ১৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত, ছাত্র-জনতার ব্যাপক অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে এই অভ্যুত্থান সফল হয়। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে প্রথম ধাপে আন্দোলনটি কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি সরকার পতনের লক্ষ্যে পরিকল্পিত ছিল।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ছাত্র-জনতার একটি বড় অংশ এই আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিল না। তারা চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নামলেও, আন্দোলনের নেতৃত্ব সরকার পতনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজ করছিল।
তিনি তার পোষ্টে বিহারিদের উপর বাঙালিদের গণহত্যার কথা উল্লেখ করেন। বিহারিদের প্রতি ছাত্র সমন্বয়কদের ভালোবাসার প্রমাণ পাওয়া যায় গত জুলাই আন্দোলনেও। কথিত আছে ঢাকায় প্রায় ৫০ হাজার বিহারির সাথে রোহিঙ্গাদেরও ব্যাবহার করেছিল তারা সরকার বিরোধী আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে। অথচ মাফহফুজ আলম বলেন না, ১৯৭১-এ বিহারিরা সান্তাহারে গণহত্যা করে, যেখানে ১০০০ জন পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল। এছাড়া, সৈয়দপুরে বিহারীরা বাঙালিদের উপর আক্রমণ করে এবং রেলওয়ে ওয়ার্কশপে বাঙালিদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারে! মাহফুজ এটাও বলেন না ৭১’এ বুদ্ধিজীবি নিধনে বিহারীদের কথা। বলেন না কবি মেহরুন নেসা, জহির রায়হান, শহীদুল্লাহ কায়সার সহ অনেক বুদ্ধিজীবি হত্যায় বিহারিদের জড়িত থাকার কথা। যেই মিরপুর বিহারি অধ্যুষিত এলাকায় ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পরে অবরুদ্ধ থাকে, যেখানে ঢাকা শহরে থাকা রাজাকার আর পাকিস্থানি সেনারা অস্ত্র সহ আশ্রয় নেয় এবং ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসেও মিরপুরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে।

মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমি
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুর মুক্তকরণ যুদ্ধ সংগঠিত হয় ও পরদিন ৩১ জানুয়ারি সকালে রাজধানীর ঢাকার মিরপুর এলাকা মুক্ত হয়। মিরপুরের যুদ্ধে জিয়াউল হক লোদী, লে. সেলিমসহ ৪১ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য, শতাধিক পুলিশ এবং মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি মিরপুর স্বাধীনতা যুদ্ধের বিস্তারিত
মাহফুজ আলমের এই স্বীকারোক্তি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি জুলাই অভ্যুত্থানের প্রকৃতি এবং এর পেছনের শক্তি সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। তবে এই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাহফুজ আলমরা চিরকালই ইতিহাসকে টুইস্ট করেছেন। টুইস্ট করতে করতে তারা এমন এক জায়গায় পৌছেছেন, যেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জন্মের ইতিহাসকেও তারা অবলীলায় অস্বীকার করছেন। বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামীলীগকে অস্বীকার করতে গিয়ে, অপ্রাসঙ্গিক করতে গিয়ে তারা নতুন ন্যারাটিভের আশ্রয় নিয়েছেন, কারন দলিল দস্তাবেজে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে স্বীকার করতে গেলে যে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলিগ-কে স্বীকৃতি দেয়া হয়ে যায়!
শুধুমাত্র এই কারনেই তারা একটা জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করতে, অস্বীকার করতে এক্মুহুর্ত ভাবছে না।
