আওয়ামী লীগ পরিবারের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধা, এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমল ৮০ হাজার

আওয়ামী লীগ পরিবারের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধা, এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমল ৮০ হাজার
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৮০ হাজার। গত বছরের তুলনায় এ বছর অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী হ্রাস পেয়েছে ৬ শতাংশের বেশি। তবে শুধু সংখ্যাই নয়—এই হ্রাসের কারণ ঘিরে এখন শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাবিমুখতা, সংগঠনভিত্তিক নিপীড়ন এবং অটোপাস সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে এক জটিল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ দেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা।

এর মধ্যেই আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ জানিয়েছে, সংগঠনকে নিষিদ্ধ করায় তাদের হাজার হাজার তরুণ নেতাকর্মী পরীক্ষা দিতে পারেনি, কেউ কেউ পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়েও হামলার শিকার হয়েছে। অজ্ঞাত মামলার আসামি হিসেবে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে মব সন্ত্রাসীরা।

সরকারি হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে মোট ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৮১ হাজার কম। অনুপস্থিতির হারও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। অথচ এমন অস্বাভাবিক চিত্রের ব্যাখ্যা মিলছে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে— কেউ দেখছেন এটি শিক্ষা-সংস্কৃতির অবক্ষয়, কেউবা বলছেন, এটি রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ফলাফল।

এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো— ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে অসাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করার পর সংগঠনটির হাজার হাজার তরুণ নেতাকর্মীর আত্মগোপনে যাওয়া বা গ্রেপ্তার হওয়াকে পরীক্ষার্থী কমে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এই প্রাচীন সংগঠনটি।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে ড. ইউনূস। তার সরকার ক্ষমতায় বসে অসংখ্য বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়, যার অন্যতম ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। নিষিদ্ধ ঘোষণার পর সংগঠনটির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান এবং হাজার হাজার কর্মী গ্রেপ্তার হন।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, “আমাদের বহু নেতাকর্মী কলেজের ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু গ্রেপ্তার আতঙ্ক, মামলা এবং রাজনৈতিক হয়রানির কারণে তারা কেন্দ্রেও যেতে পারেনি। এই সংখ্যা বহু।”

তিনি জানান, এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছাত্রলীগের কর্মী, যারা দমন-পীড়নের শিকার হয়ে পরীক্ষা দিতে পারেনি।

ঢাকার একটি সরকারি কলেজের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইদানিং পরীক্ষাবিমুখ আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অটোপাসের জন্য সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো ঘটনাও আমরা দেখেছি। তেমনি তাদের নানা অযৌক্তিক দাবি পূরণ হতেও দেখেছি। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষাবিহীন সনদ পাওয়ার মানসিকতা গড়ে উঠেছে।

তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের সঙ্গে পরীক্ষার্থী হ্রাসের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না। তিনি বলেন, “এটিও একটি বড় কারণ হতে পারে। এইচএসসি প্রথম বর্ষ থেকেই বহু শিক্ষার্থী এই সংগঠনের নানা কর্মসূচিতে অংশ নেয়। আমাদের কলেজে এ বছর বহু শিক্ষার্থী প্রি-টেস্টে অংশ নেয়নি, বিশেষত যারা এই ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।”

পরীক্ষার প্রথম দিনেই অনুপস্থিতির সংখ্যায় চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। প্রথম দিন ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী উপস্থিত হয়নি, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৯৭০। অর্থাৎ অনুপস্থিতির হার ২০২৪ সালে যেখানে ছিল ১.০৭%, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৫৬%-এ। প্রথম দিন ৪৩ জন পরীক্ষার্থী অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে বহিষ্কৃত হয়েছেন।

ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, “আজকেও শতাধিক শিক্ষার্থী পরীক্ষার কেন্দ্রে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে রক্তাক্ত হয়েছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। শুধু এইচএসসি পরীক্ষা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আমাদের নেতাকর্মীরা প্রবেশ করতে পারছে না। এমনকি অনেক শিক্ষকও যেতে পারছেন না, যাঁদের একমাত্র অপরাধ তাঁরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করেন।”

তিনি আরও বলেন, “ইউনূসের অবৈধ সরকারের দমন-পীড়ন থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়েছে, এখন তারা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করতে চাচ্ছে।”

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এক বিবৃতিতে বলেছে, “অবৈধ-অসাংবিধানিক-জঙ্গি গডফাদার ইউনূসের কারণে এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি সমমান পরীক্ষায় প্রায় সোয়া ৪ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি ও গাফিলতিতে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।”

ছাত্রলীগের দাবি, শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার, অথচ বর্তমান সরকারের দমনমূলক আচরণ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না। শিক্ষা উপকরণ ধ্বংস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার, সনদ বাতিল, মামলা, হত্যা হুমকি ও প্রাণহানির আশঙ্কায় বহু শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।

এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী তাদের দুঃখ প্রকাশ করেছে। ফেসবুকে পোস্ট করে অনেকেই জানিয়েছেন, শুধুমাত্র ছাত্রলীগ করার ‘অপরাধে’ তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।

রাদোয়ান আহমেদ নামের একজন লিখেছেন, “আমার অপরাধ আমি ছাত্রলীগ করি, আমার অপরাধ আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করি, আমার অপরাধ আমি জননেত্রী শেখ হাসিনার একজন ক্ষুদ্র কর্মী। তাই আজকে আমার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও দিতে পারি নাই, আজকে যখন সবাই পরীক্ষা দিচ্ছে তখন আমি নান্দাইল থেকে অনেক দূরে।”

আরিফুল ইসলাম সাজিদ নামে একজন লিখেছেন, “আজকে ছাত্রলীগ করার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারি নাই। ইতিহাসটা মনে রেখো বাঙালি জাতি।”

আরেক শিক্ষার্থী পিয়াস পাটোয়ারী লিখেছেন, “ছাত্রলীগ করার কারণে এলাকায়ও যাইতে পারলাম না, এইচএসসি পরীক্ষাও দিতে পারলাম না।”

কামরুল ইসলাম লিখেছেন, “রাজনীতি খাইলো আমার এইচএসসি। অনেক কিছু বলার আছে, আজ আর নয়। বেঁচে থাকলে বিসিএস ক্যাডার হবো।”

এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে ফিনল্যান্ডপ্রবাসী গবেষক ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মতিউর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমানে যে অস্থিরতা চলছে, তা শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে সামাজিক সংকট—এই দুইয়ের চাপে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজ ঝরে পড়ার মুখে।”

তিনি আরও বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানিয়ে, বরং রাজনৈতিক দল, সরকার ও শিক্ষানীতি নির্ধারকদের দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।”

Visited 8 times, 1 visit(s) today