ইরান-ইসরায়েল সংকট: ইরানকে ৩০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের

ইরান-ইসরায়েল সংকট: ইরানকে ৩০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের
শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত গত কয়েক সপ্তাহে নাটকীয়ভাবে তীব্রতর হয়েছে। এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পর এখন কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনার জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে, যা এই সংকটে নতুন মোড় এনেছে।

গত ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে, যার মধ্যে ফোর্ডো, নাতানজ এবং ইসফাহানের পারমাণবিক সাইটগুলো লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইসরায়েল দাবি করেছে, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা রোধ করা। ইরান অবশ্য বরাবরই বলে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।

ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরায়েলের সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে শতাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালায়। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের হামলায় ইরানে ৬১০ জন নিহত এবং ৪,৭৪৬ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের হামলায় তাদের দেশে ২৮ জন নিহত হয়েছে। এই পারস্পরিক হামলায় তেহরান ও তেল আবিবের মতো বড় শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

২১ জুন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যখন তারা ইরানের তিনটি পারমাণবিক সাইটে ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ বোমা দিয়ে হামলা চালায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো “সম্পূর্ণ ধ্বংস” হয়েছে। তবে, সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে মাত্র কয়েক মাস পিছিয়ে দিয়েছে, এবং ফোর্ডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাইটে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব

সাম্প্রতিক উন্নয়ন হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনার জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রস্তাবটি মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকভাবে ইরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছে, যদিও এর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, “ইরান কূটনীতির প্রতি গুরুত্ব দেয়, তবে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অটল।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাবের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা করে বলেছেন, “আমেরিকা কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ইরান এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।” তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি পুনরায় হামলা চালায়, তবে তা “অপূরণীয় ক্ষতির” কারণ হবে।
যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা

২৩ জুন ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়েছে। তবে, এই যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা ইরান অস্বীকার করেছে। ট্রাম্প উভয় পক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “দুই দেশকেই শান্ত হতে হবে।”

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে সহযোগিতা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়, যতক্ষণ না ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। এদিকে, আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রসি ইরানকে সংস্থার সঙ্গে পুনরায় সহযোগিতা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এই সংকটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, এবং জাপান ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র বিকাশ থেকে বিরত থাকতে এবং কূটনৈতিক সমাধানের জন্য আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। সৌদি আরব, কাতার, এবং কুয়েত এই সংঘাতের কারণে উদ্ভূত উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো, যেমন কিউবা, চিলি, এবং ভেনেজুয়েলা, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা করেছে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব সংকট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে, তবে ইরানের পক্ষ থেকে এটি গ্রহণ করা হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা এবং জনগণের মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তেহরানের একজন বাসিন্দা রেজা শরিফি বলেন, “যুদ্ধ শেষ হয়েছে, তবে এটি শুরুই হওয়া উচিত ছিল না।”

ইরান-ইসরায়েল সংকট এখন একটি সূক্ষ্ম পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সংঘাতকে শান্ত করতে পারে, তবে উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক জটিলতা এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার দিকে তাকিয়ে আছে।

Visited 6 times, 1 visit(s) today