মতামত।। একটি জাতির সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য তখনই হয়, যখন সে নিজেই তার ইতিহাসকে ধ্বংস করে।

মতামত।। একটি জাতির সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য তখনই হয়, যখন সে নিজেই তার ইতিহাসকে ধ্বংস করে।
শেয়ার করুন

-চারু পিন্টু

ঢাকার বিজয় সরণি—একটি নাম, একটি পথ, একটি ইতিহাস। যেখানে পদচিহ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর, যেখানে প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি খোদাই সাক্ষ্য ছিলো এক জাতির জন্মের। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো একটি ভাস্কর্য—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি, আর তার চারপাশে দৃশ্য ছিলো আমাদের সংগ্রামের, আমাদের রক্তাক্ত জয়ের ইতিহাসের নিঃশব্দ দলিল।

আজ সেই দেয়ালের সামনে পড়ে আছে ভাঙা ইট, মুচড়ে যাওয়া লোহার রড, আর ধুলোমাখা স্মৃতি—যা এখন আর কেউ ছুঁতে চায় না। বিশাল হলুদ এক্সকাভেটরটা দাঁড়িয়ে, মাথা নুইয়ে, যেন নিজেই লজ্জিত তার কাজের জন্য। কিন্তু যন্ত্রের কি বোধ থাকে?

সেই দেয়াল যেটাতে আঁকা ছিল ভাষা শহীদদের লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়া ছাত্রদের দৃশ্য—আজ তার ওপর উঠে বসে আছে যন্ত্রদানব। সেই দেয়াল, যেখানে বঙ্গবন্ধু এক হাতে মাইক্রোফোন ধরে উচ্চারণ করেছিলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম”—আজ সেখানে পিষে যাচ্ছে তারই কণ্ঠের প্রতিধ্বনি।
একটা সময় ছিল, যখন এই জায়গার পাশে দাঁড়িয়ে একজন বাবা তার সন্তানকে বলতো,
“দেখো বাবা, এই দেয়ালে তোমার দাদার গল্প আঁকা। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা।”
আজ সেই বাবা কাঁদছে—চুপচাপ, কাউকে না দেখিয়ে। কারণ তিনি জানেন, এখন সে দেয়াল আর নেই।

একজন বৃদ্ধা মহিলা—বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভাঙা ভাস্কর্যের পাশে। তাঁর চোখে অশ্রু নয়, বরং শূন্যতা। কারণ এই দেয়ালের কোথাও ছিল তাঁর শহীদ ছেলের মুখ। এখন সে মুখ ধুলোয় গড়াগড়ি খায়। তিনি আর কাঁদেন না, কারণ কাঁদতে কাঁদতে চোখ শুকিয়ে গেছে বহু বছর আগে।
তিনি শুধু ফিসফিস করে বলেন, “আমার ছেলে কি তবে ভুল ছিল মা?”

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর, স্কুলব্যাগ পিঠে—দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর মাটিতে পড়ে থাকা একটি রঙচটা ইট তুলে নেয়। সেটা বুকের কাছে চেপে ধরে।
জানেও না, কেন তার বুক ভার হয়ে আসছে।

এ দৃশ্য শুধু একটি ভাস্কর্যের ধ্বংস নয়।
এ যেন একে একে কফিনে ঢুকে যাওয়া সব শহীদের আত্মা, যাদের নাম আর মুখ আমাদের চোখের সামনে ধুলোর নিচে চাপা পড়ে গেল।
কেউ বলবে, “ভাস্কর্যটা সরানো হয়েছে উন্নয়নের জন্য।”
কিন্তু উন্নয়ন যদি হয় ইতিহাস মুছে ফেলার শর্তে, তাহলে সে উন্নয়ন নয়—তা আত্মঘাতী।
যেখানে একটা জাতি নিজের ইতিহাসের দেয়াল নিজ হাতে ভেঙে ফেলে, সেখানে আর কিছু ভাঙার বাকি থাকে না।

এই ছবি, এই মুহূর্ত, এই ধ্বংস—কোনো একটা মুহূর্তে যেন আমাদের গলা চেপে ধরে বলে,
“তোমরা কি সত্যিই মুক্ত হয়েছিলে, নাকি শুধু ভুলে যাওয়ার স্বাধীনতা পেয়েছিলে?”
একটি জাতির সবচেয়ে করুণ পরিণতি তখনই হয়, যখন সে নিজেকে ভুলে যায়।
এ ভাঙা দেয়াল সেই বিস্মৃতির শুরু।
আর আমাদের চোখে জমে থাকা অশ্রু—হয়তো শেষ প্রতিরোধ।

বিকেলের আলোয়, যখন সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে, তখন এক বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা সেই ভাঙা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা হাতে তুলে নিচ্ছেন একটি ইট। হয়তো এই ইটটি কোনোদিন তাঁর বন্ধুর রক্তে ভেজা ছিলো। হয়তো এই দেয়ালের গায়ে তাঁর ইতিহাস ছিলো আঁকা, যা এখন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে।
আমরা কি সেই অশ্রুকেই বাঁচিয়ে রাখতে পারবো। ছবির প্রতিচ্ছবি শুধু এক খণ্ড ভাঙা দেয়াল নয়, এটা এক জাতির আত্মার আর্তনাদ।
কারণ ইতিহাস ভাঙে না, কিন্তু আমরা ভেঙে ফেলি নিজেকেই।

আর একবার ভেঙে গেলে—কোনো জয় আর বিজয় সরণি হয়ে ফিরে আসে না।

Visited 5 times, 1 visit(s) today