লিবারেশন আর্কাইভ ইন্সটিটিউট
১৯৭১ সালের ১৯ মে, বুধবার| বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দিনটি এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে আছে| এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বর্বরতা ও প্রতিহিংসার নির্মম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানুএর গ্রামের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও নিরীহ মানুষ হত্যার মাধ্যমে|
ধানমণ্ডির ৩২ নাম্বার বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ জামাল পালিয়ে গেলে তাকে খুঁজতে হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ির দিকে অগ্রসর হয়| সেখানে পৌঁছে তারা তল্লাশির নামে তাণ্ডব চালায় এবং এক পর্যায়ে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়| মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী সেই বসতভিটা|
শুধু অগ্নিসংযোগেই থেমে থাকেনি বর্বরতা| হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গ্রামের নিরীহ মানুষদের হত্যা করে|
নিহতদের মধ্যে ছিলেন শেখ মিন্টু, কাজী তোরাব আলী, শেখ আরশাদ আলী, মোঃ লিয়াকত ওরফে লিকু, ধলা মিয়া, কবিরাজ ও সরদার—যাদের অপরাধ ছিল শুধু এই মাটিতে জন্ম নেওয়া|
এ সময় শেখ পরিবারের সদস্য শেখ বোরহান উদ্দিনকে পাক বাহিনী আটক করে| তবে মানবিক বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের আশ্রয় নিয়ে তার ফুফু তাকে ‘কাজের ছেলে’ পরিচয়ে মুক্ত করে আনতে সক্ষম হন—যা সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এক বিরল সাহসিকতার উদাহরণ|
অন্যদিকে, পাক বাহিনী শেখ আকরাম হোসেন, কাজী সাহাউল আলম ও শেখ ইমাম হোসেনকে ধাওয়া করে| জীবন বাঁচাতে শেখ আকরাম দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন| আর কাজী আলম ও শেখ ইমাম আশ্রয় নেন কাজী নওশের আলীর গোলা ঘরে, যেখানে লুকিয়ে থেকে তারা প্রাণে বেঁচে যান|
পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠলে বঙ্গবন্ধুর মা-বাবাকে নিরাপত্তার জন্য মৌলভী আব্দুল বারী বিশ্বাসের বাড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়| কিন্তু সেখানেও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় পরে তারা আশ্রয় নেন ঝিলু বিশ্বাসের বাড়িতে| মুক্তিযুদ্ধ তীব্রতর হলে হেমায়েত বাহিনীর দুই সদস্য—আলম ও ফারুখ—তাদের শিবচরের ইলিয়াস চৌধুরীর বাড়িতে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন|
এই ঘটনাগুলো শুধু একটি পরিবারের ওপর হামলা নয়; বরং এটি ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার এক নৃশংস প্রয়াস| কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—এমন বর্বরতা বাঙালিকে দমাতে পারেনি, বরং স্বাধীনতার লড়াইকে আরও দৃঢ় করেছে|
১৯ মে’র এই নির্মম স্মৃতি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জনের পথ কতটা রক্তাক্ত ও ত্যাগে ভরা ছিল|
