ধরা পড়ার আগে সুব্রত বাইন বিদেশের কারগারে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে পালিয়েছিলেন

ধরা পড়ার আগে সুব্রত বাইন বিদেশের কারগারে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে পালিয়েছিলেন
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় ২ দশকের বেশি সময় বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে কলকাতা ও নেপালে আস্তানা তৈরি করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন। সেখানেই তৈরি করেন সাম্রাজ্য, সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতেন বাংলাদেশে তার নেটওয়ার্ক। তাকে ধরতে কলকাতা পুলিশের বিশেষ অভিযানে নেতৃত্ব দেন চৌকস কর্মকর্তা রাজীব কুমার।

২০০৮ সালে কলকাতার পাম অ্যাভিনিউ থেকে ধরা পড়েন সুব্রত। কলকাতা জেলে অনেকদিন থাকার পর জামিন পেয়েই নেপালে পালিয়ে যান তিনি। সেখানে ধরা পড়ে জেলে যান। আবার সুড়ঙ্গ তৈরি করে ফের জেল থেকে পালান। আবারও তাকে ধরতে ভূমিকা রাখেন রাজীব কুমার।

নেপালে অভিযান চলাকালীন কলকাতা পুলিশ কূটনৈতিক সীমা লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করে সেদেশের সরকার। পরে তা কূটনৈতিকভাবে মীমাংসা করা হয়।

সুব্রত বাইন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে মোস্ট ওয়ান্টেড। তার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৩০টি খুনের মামলা রয়েছে। ২০০৩ পর্যন্ত সুব্রত বাইন ছিলেন ঢাকার অপরাধ জগতের প্রভাবশালী চক্র সেভেন স্টার গ্রুপের প্রধান। নব্বই দশকে তার উত্থান। ২০০১ সালে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় যে ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, সুব্রত বাইন তাদের অন্যতম। তিনি ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পশিচমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় অপরাধ জগতে ঢুকে পড়েন।

কলকাতা পুলিশ তাকে ২০০৮ সালে আটক করলেও জামিনে মুক্ত হয়ে যান। আবার চলে যান আন্ডারগ্রাউন্ডে। ২০০৯ সালে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সে কর্মকর্তারা জানতে পারেন সুব্রত বাইন নেপালে ঢুকেছে। নেপাল সীমান্তের কাকরভিটা শহরে ঢুকে সেখানকার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন সুব্রত। তাকে পূর্ব নেপালের ভাদ্রপুর জেলে রাখা হয়। পরে ঝুমকা জেলে রাখা হয়।

২০১২ সালে জেল থেকে ৭৭ ফুট লম্বা সুড়ঙ্গ দিয়ে অপর ১০ জন বন্দীর সঙ্গে সুব্রত বাইন পালিয়ে যান। নেপালের জেল থেকে পালানোর জন্য সুব্রত ও বাকিরা রাতের আঁধারে মাটি কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করেন। বাঁশ কাটার ছুরি দিয়ে মাটি কেটে ২০ ইঞ্চি চওড়া ও ২২ ইঞ্চি উচ্চতার সুড়ঙ্গটি তৈরি করেন। কলকাতার পুলিশ কর্মকর্তা রাজীব কুমার আবারও সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করেন।

২০১২ সালে বাংলাদেশের শীর্ষ অপরাধী সুব্রত বাইনকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ও স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) যৌথ অভিযামে বহুবাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ভারত থেকে তাকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছে কিছুদিন পূর্বে। এরপরই তিনি গ্রেপ্তার হন।

অস্ত্রসহ যৌথবাহিনীর অভিযানে আটক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত অভিযানে কুষ্টিয়া ও রাজধানী ঢাকায় এক বড় ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দেশজুড়ে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের দুই সহযোগীকে।

২৭শে মে, মঙ্গলবার ভোরে পরিচালিত এ অভিযানে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী (৬০) এবং আবু রাসেল মাসুদ ওরফে মোল্লা মাসুদ (৫৪)। একইসাথে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে ধরা হয় তাদের দুই সহযোগী আরাফাত ওরফে শুটার আরাফাত এবং শরীফকে।

ঢাকা সেনানিবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরী এই তথ্য জানান।

তিনি বলেন, গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভোর ৫টার দিকে অভিযান শুরু হয় এবং এটি সেনাবাহিনীর অপারেশন দক্ষতা, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি বলেন, “গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ দেশের মোস্ট ওয়ান্টেড ২৩ জন সন্ত্রাসীর তালিকায় রয়েছে। তারা কুখ্যাত ‘সেভেন স্টার’ অপরাধ সিন্ডিকেটের মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্বদানকারী হিসেবে পরিচিত।”

অভিযানে অংশ নেয় সেনাবাহিনীর ৪৬ ইনডিপেনডেন্ট ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডসহ একাধিক সামরিক ও গোয়েন্দা ইউনিট। অভিযানের সময় পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড গুলি এবং একটি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।

অভিযানটি পরিচালিত হয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির ভিত্তিতে, যাতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

আইএসপিআর পরিচালক আরও বলেন, “এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশে হত্যা, চাঁদাবাজি এবং নানা ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল। তাদের গ্রেপ্তার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় একটি বড় অগ্রগতি।”

অপারেশনে সহায়তা করে সেনা সদর দপ্তরের মিলিটারি অপারেশনস ডিরেক্টরেট, ৫৫ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন, ১৪ ইনডিপেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড, ৭১ মেকানাইজড ব্রিগেড এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)।

সেনাবাহিনী পক্ষ থেকে দেশের জনগণকে আহ্বান জানানো হয়েছে, যদি কেউ কোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড বা সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত তথ্য পান, তা হলে দ্রুত নিকটস্থ সেনা ক্যাম্প বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে অনুরোধ করা হয়।

Visited 152 times, 1 visit(s) today