দেশে খুরারোগের কার্যকর টিকা উদ্ভাবিত হয়েছে ২০১৮ সালে, তবুও কেন আমদানি-নির্ভরতা কমানো যাচ্ছেনা? ভ্যাকসিন সরবরাহের কাজ পেতে মরিয়া কারা?
নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৯শে মে, ২০২৫
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গরু-মহিষ ও ভেড়া-ছাগলের জন্য খুরারোগের (FMD) টিকা কিনছে একই কোম্পানি থেকে—কিন্তু একই পরিমাণ টিকা কেনায় দুই মাসের ব্যবধানে ব্যয় বাড়িয়েছে ১৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা থাকলেও, বেশি দামে প্রস্তাব দেওয়া ‘পছন্দের’ প্রতিষ্ঠান ওএমসি লিমিটেডকে কাজ দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ডোজ খুরারোগের টিকা কেনা হচ্ছে ‘পিপিআর রোগ নির্মূল এবং খুরারোগ নিয়ন্ত্রণ’ প্রকল্পের অধীনে।
প্রথমে ওএমসি এই পরিমাণ টিকা ৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকায় সরবরাহ করতে চাইলে তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। পরে তৃতীয় দফা দরপত্রে ওএমসি একই টিকার দর বাড়িয়ে ৯৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা দিলে এবার কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। অথচ এই দফায় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল জেনটেক নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান, যারা ২০ কোটি টাকা কম দামে টিকা সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেনটেক এর আগে সফলভাবে রাশিয়া থেকে এই টিকা আমদানি করে সরবরাহ করেছে। আর নামী প্রতিষ্ঠান রেনাটা আগের দরই ধরে রাখলেও কাজ দেওয়া হয়নি তাদেরও। অথচ ওএমসি দ্বিতীয়বার দরপ্রস্তাব দেওয়ার সময় দর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়ে দেয়। এর পেছনে প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আবু সুফিয়ান স্বীকার করেছেন, এমন একজন ব্যক্তি দপ্তরে এসেছিলেন, তবে টিকা প্রসঙ্গে আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি ছাত্র সমন্বয়ক ছিলেন বলে জানা গেছে। যিনি এসেছিলেন তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের অত্যন্ত ‘প্রভাবশালী’ কোনো ব্যক্তি বলে জানিয়েছে সূত্র।

প্রকল্প পরিচালক অমর জ্যোতি চাকমা জানান, দরপত্রে শর্ত শিথিল করা হয়েছিল, ফলে ওএমসি কাজ পেয়েছে। কী শর্ত শিথিল করা হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মুখস্থ নেই’।
টিকা নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেনটেকের টিকা পশুর গর্ভপাত বা মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—যদিও তার কোনো লিখিত বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেননি।
একই পরিমাণ পণ্য কিনতে দুই মাসের ব্যবধানে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা বেশি খরচ হওয়ার পরও কেন দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন বা দর হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া হলো না? এ বিষয়ে মহাপরিচালক আবু সুফিয়ান বলেন, শুধু দামের বিষয় নয়, টিকার গুণগত মানকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তবে কেন কম দামে উচ্চমানের পণ্য সরবরাহের আগের রেকর্ড থাকা প্রতিষ্ঠান জেনটেককে বাদ দেওয়া হলো, সে প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
অভিযোগ ওঠার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২৪শে মার্চ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে অভিযান চালায়। প্রকল্প পরিচালক অনুপস্থিত থাকায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন তারা এবং প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংগ্রহ করেন। দুদকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানানো হয়, বিষয়টি এখন তদন্তাধীন।
এই ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়াকে “স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় অর্থব্যয়ের প্রশ্নবিদ্ধ উদাহরণ” হিসেবে দেখছেন অর্থনীতি গবেষক ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তিনি বলেন, “যেভাবে টেন্ডার বাতিল ও শর্ত শিথিল করে বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা যায় রাষ্ট্রের অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি।”
উল্লেখ্য, ওএমসি’র কাছ থেকে হতে অতিরিক্ত মূল্যে বাংলাদেশে নন রেজিস্টার্ড আর্জেন্টাইন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য বৈছা সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমের নির্দেশ বাস্তবায়নে সুপারিশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠান হয়েছে, এমন একটি তথ্য গত মার্চে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই বিষয়টি সবার সামনে এসেছিল।
ওএমসি লিমিটেডের পক্ষ থেকে এই ভ্যাকসিন সরবরাহ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, খুরারোগ গবাদিপ্রাণির একটি অন্যতম প্রধান সংক্রামক রোগ যা গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, শুকর সহ অন্যান্য প্রাণিকে আক্রমন করে। এটি Picornavirdae পরিবারভুক্ত Aphthovirus গণের খুরারোগ ভাইরাস (FMD Virus) দ্বারা সংঘঠিত হয়। খুরারোগ বাংলাদেশে দেশব্যাপী বিরাজমান এবং খুরারোগের ভাইরাসের ৭টি সেরোটাইপের মধ্যে ৩টি সেরোটাইপ যথা O, A এবং Asia1 এ দেশে সঞ্চরণশীল আছে। খুরারোগের কারণে বাংলাদেশে বাৎসরিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১২৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে ২০১৮-তে খুরারোগের কার্যকর ভ্যাক্সিন উদ্ভাবন হলেও কেন বিদেশ নির্ভরতা?
গবাদিপশুর খুরারোগ প্রতিরোধে ২০১৮ সালে একটি কার্যকরী টিকা উদ্ভাবন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একদল গবেষক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) আওতায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এ উদ্ভাবনের পেটেন্টের জন্য সেসময় আবেদন করা হয়েছে।

এ গবেষণার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগকে দুটি উপপ্রকল্পের আওতায় মোট ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ১৭ জন গবেষক এই উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
সেসময় বিশেষজ্ঞরা জানান, এই রোগে ব্যবহৃত টিকা আমদানি করতে হয়। এসব টিকা উৎপাদনে যে ভাইরাসটি ব্যবহৃত হয়, তা দেশে বিদ্যমান ভাইরাস থেকে ভিন্ন এবং টিকার জন্য পর্যাপ্ত এন্টিজেন থাকে না। ফলে কার্যকর হয় না। উদ্ভাবিত নতুন টিকা বাংলাদেশে বিদ্যমান খুরা রোগের তিন ধরনের ভাইরাসের সব ধরনের সংক্রমণ থেকে গবাদিপশুকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম। এর দাম বাজারে প্রচলিত ভ্যাকসিনের চেয়েও কম হবে। খামারি পর্যায়ে প্রতিটি টিকা ৬০-৭০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে।
দেশে কার্যকর টিকা উৎপাদনের পরেও কেন বিদেশমুখিতা এখনও, এ প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট মহলের।
