নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৯শে মে, ২০২৫
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জুলাই-আগস্টের সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে নাশকতাকারীদের পক্ষের আইনজীবীদের ‘মারধর ও হত্যাচেষ্টা’ মামলায় আওয়ামীপন্থি ও দলীয় সমর্থক আইনজীবীদের হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিতই রাখলেন আপিল বিভাগে।
আজ ১৯শে মে, সোমবার রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন শুনানি শেষে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্থগিতাদেশ বহাল রেখে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির আদেশ দেন।
এর আগে, হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করলে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক গত ২৯শে এপ্রিল জামিন স্থগিত করেন। সেই সঙ্গে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ শুনানি হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া। আসামিদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এমকে রহমান ও মোতাহার হোসেন সাজু।
আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, ৬১ জন আইনজীবীকে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছিলেন, যা চেম্বার আদালতে স্থগিত হয়। আজকে আপিল বিভাগ জামিন স্থগিত রেখে দুই সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টকে রুল নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এর আগে ‘মারধর ও হত্যাচেষ্টার’ মামলায় আওয়ামী লীগ সমর্থক ৬১ আইনজীবীকে গত ৬ই এপ্রিল কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন। পরে তাঁরা হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন।
বাংলাদেশে আইনজীবীদের হয়রানি ও বৈষম্যের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ
বাংলাদেশে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে বিচারিক হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে International Observatory of Lawyers in Danger (OIAD)।
ফ্রান্সের জাতীয় বার কাউন্সিল, প্যারিস বার, স্পেনের সাধারণ আইনজীবী পরিষদ এবং ইতালির জাতীয় ফরেনসিক কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে গঠিত এই আন্তর্জাতিক সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে—বাংলাদেশে এই দমনমূলক কার্যক্রম একটি সমন্বিত কৌশলের অংশ, যা আইন পেশার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে খুন, সহিংসতা, বিস্ফোরক ব্যবহার এবং জনশৃঙ্খলা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ এনে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। OIAD-এর মতে, এসব মামলা ভিত্তিহীন, রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইনজীবীদের দমন ও নিরুৎসাহিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন এমন অনেক প্রখ্যাত আইনজীবী, যারা তাদের পেশাগত নিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের প্রতি প্রতিশ্রুতির জন্য সুপরিচিত। এসব মামলা ও হয়রানি একটি ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যেখানে আইনজীবীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না এবং দেশের আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
এই ঘটনাকে পেশাগত সংগঠনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে OIAD এবং বলছে, এটি বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনি সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
OIAD বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন অবিলম্বে এসব হয়রানি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা বন্ধ করা হয় এবং নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়।
একইসঙ্গে, বার নির্বাচনে অযৌক্তিকভাবে অযোগ্য ঘোষিত প্রার্থীদের অংশগ্রহণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, জাতিসংঘের “Basic Principles on the Role of Lawyers” অনুযায়ী আইন পেশার স্বাধীনতা রক্ষা করা প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
OIAD মনে করে, একটি স্বাধীন ও নিরাপদ আইন পেশা ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কার্যকরভাবে টিকতে পারে না। বাংলাদেশে আইনজীবীদের ওপর চলমান দমনমূলক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
