অ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম সৈকত
১২ মে ২০২৫ তারিখে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক পরিসরে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। সরকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ সমর্থকদের যাবতীয় কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। এই পদক্ষেপ শুধু বেআইনি ও অসাংবিধানিক নয়, এটি একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তির ওপর গুরুতর আঘাত।
বিশেষ করে, এই সিদ্ধান্ত দেশের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ও মৌলিক মানবাধিকারকে লঙ্ঘন করেছে, যা একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল চেতনাকে বিপন্ন করে।
আমরা একে সোজাসাপ্টা বললে বলতে পারি, সরকারের এই পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নির্বিচারে ধ্বংস করার এক কূটকৌশল। বাংলাদেশের জনগণ বছরের পর বছর ধরে সংগ্রাম করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু আজ, যে সরকার জনগণের জন্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা, সেই সরকারই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে—যা গণতন্ত্রের প্রতি এক গুরুতর হুমকি।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রথম ও প্রধান সমস্যা এর বৈধতা। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো মামলার রায় প্রমাণিত হয়নি। সুতরাং, সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। একটি দলকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষিদ্ধ করা, যার সমর্থন দেশের অর্ধেক জনগণের রয়েছে, তা জনগণকে অবজ্ঞা করার শামিল। আওয়ামী লীগসহ যেকোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে জনগণের মতামত ও আইনি প্রক্রিয়া অবশ্যই অনুসরণ করা উচিত ছিল, যা এখানে পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে।
এটি স্পষ্ট যে, সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে, যেখানে জনগণের মতামত বা স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই। সরকারের পক্ষ থেকে যে আইনি বা সাংবিধানিক ভিত্তি দেখানো হয়েছে, তা একেবারেই অস্বচ্ছ ও অযৌক্তিক। তাই একটাই প্রশ্ন উঠছে—কোন আইনের অধিকারী হয়ে একটি দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো? এর ফলে বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের পূর্ববর্তী সুপারিশে বলা হয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা উচিত নয়; বরং তাদের রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষিত রাখা উচিত। অথচ বাংলাদেশ সরকার এই আন্তর্জাতিক সুপারিশের বিপরীত পথে হাঁটছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার একটি স্বচ্ছ ও বৈধ প্রক্রিয়া থাকা আবশ্যক, যা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। জাতিসংঘের সহায়তায় যদি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতি ঘটে থাকে, তবে এই পদক্ষেপ জাতিসংঘের মৌলিক দিকনির্দেশনা লঙ্ঘনের শামিল। এর ফলে দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অনিবার্য।
মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ অনুসারে, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাভাবিকতা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে। জাতিসংঘ কখনোই রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়, অথচ বাংলাদেশ সরকার তা উপেক্ষা করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে এবং সরকারের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের আলোকে প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে সরকার শুধু আওয়ামী লীগকে দায়ী করে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারে? শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে, তবে তা আদালত বিচার করবে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দোষীকে শাস্তি দেবে। কিন্তু সরকার একতরফাভাবে পুরো একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আরও বিস্ময়কর যে, নিষেধাজ্ঞা জারির আগে ৫-১৫ই আগস্টের মধ্যে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ড—যেমন থানায় হামলা, সরকারি অফিস ও আদালত ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও পুলিশের সদস্যদের হত্যা—এসব ঘটনার তদন্ত বা বিচারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্নাইপার রাইফেল দিয়ে চালানো হত্যাকাণ্ডের পেছনে কে ছিল, তা এখনো অজানা। সরকারের এই ব্যর্থতা ও অসৎ উদ্দেশ্যই পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। সহিংসতার দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো হলেও বাস্তবে সরকারের ভূমিকা ও ব্যর্থতাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সরকারের এই পদক্ষেপ জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করবে এবং রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়াবে। অথচ জাতীয় ঐকমত্য, সংলাপ ও সহনশীলতা—যা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মৌলিক দায়িত্ব—তা এখানে অনুপস্থিত। বরং সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ব্যস্ত, ফলে দেশ আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে। এমন চলতে থাকলে, দেশে আবারও রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দিতে পারে, যা গণতন্ত্র ও ভবিষ্যতের জন্য চরম হুমকি।
একাধিক রাজনৈতিক দলের চ্যালেঞ্জ ও মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সরকারকে স্মরণ রাখতে হবে, জনগণের প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতেই একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করা উচিত। আজ আমরা যা দেখছি তা হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একনায়কতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও অবজ্ঞার নামান্তর।
আজ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলেও ভবিষ্যতে অন্য দলগুলোকেও এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে। একবার এই নজির তৈরি হলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনবে।
বাংলাদেশের জনগণ কখনোই তাদের স্বাধীনতা ও ভোটাধিকারকে হরণ করতে দেবে না। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল দেশের রাজনীতিই নয়, বরং সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি এবং জাতির ভবিষ্যতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
লেখক:বাংলাদেশি মানবাধিকার আইনজীবী; লরিয়েট, ফ্রান্স সরকারের ম্যারিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার ২০২৩; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ); ইমেইল: [email protected], ওয়েবসাইট: www.jmbf.org
