নিজস্ব প্রতিবেদক
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের নামে স্লোগান তুলে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলছেন, “এটা গোলাম আযম-নিজামীর বাংলাদেশ না, এটা মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব আর জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ।”
১৩ই মে, মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
‘গোলাম আযমের বাংলা’ বলে দেওয়া স্লোগানকে কটাক্ষ করে রফিকুল বলেন, “তারা তো কোনোদিন বাংলাদেশ চাননি, পাকিস্তানকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন।”
বিতর্কিত স্লোগান ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অতীত
গত সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে ও পরে শাহবাগে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর ডাকে আয়োজিত কর্মসূচিতে জামায়াত-শিবির, ইসলামী আন্দোলন ও হেফাজতের কর্মীদের অংশগ্রহণ দেখা যায়। সেখানেই “গোলাম আযমের বাংলায় আওয়ামী লীগের ঠাঁই নেই”, “নিজামীর বাংলায় আওয়ামী লীগের ঠাঁই নাই”—এই ধরনের স্লোগান দেওয়া হয়। এই স্লোগান নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
জমায়েতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময় একদল অংশগ্রহণকারী “এটা আমাদের গান না” বলে বাধা দেয়—এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যা নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
গোলাম আযম ২৫শে মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাপতি টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতকারী’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। নিজামী সেই সময় ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রধান হিসেবে আলবদর বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দেন। ওই বাহিনীর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
১৯৭১ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজয় সন্নিকটে টের পেয়ে গোলাম আযম পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকার বিমানবন্দরে রাজাকারদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দেন। ‘জীবনে যা দেখলাম’ বইয়ে এসব তথ্য নিজেই লিখে গেছেন তিনি।
অন্যদিকে নিজামী ২২শে এপ্রিল আলবদর গঠনের পরদিনই দৈনিক পাকিস্তানে বিবৃতি দিয়ে লেখেন— “যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী, সেখানেই আলবদর। যেখানে দুষ্কৃতকারী, সেখানেই আলবদর।”
একই বছর ১৪ই ডিসেম্বর দৈনিক সংগ্রামে লেখা নিবন্ধে তিনি বলেন, “আলবদর তরুণ মর্দে মুজাহিদরা হিন্দু বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে সারা বিশ্বে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করবে।”
‘ক্ষমা না চাইলে রেহাই নেই’
ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, “জামায়াতকে জাতির কাছে একাত্তরের জন্য ক্ষমা চাইতেই হবে। ২০২৪-এ তারা আমাদের সঙ্গে ছিল, সে জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু ইতিহাসের দায় তারা এড়িয়ে যেতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাকে জাফরুল্লাহ চৌধুরী মৃত্যুর মাস খানেক আগে বলেছিলেন— ‘যতক্ষণ জামায়াত ক্ষমা না চায়, তোমরা জামায়াতের কোনো অনুষ্ঠানে যাবে না।’ আমরা সেই নির্দেশ মেনে চলেছি।”
জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে রফিকুল বলেন, “যারা জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের আস্ফালন দেখাচ্ছেন, তারা সাবধান হয়ে যান। আমাদের জাতীয় পরিচয়ের এই প্রতীক নিয়ে কেউ খেলতে পারবে না।”
সভায় তিনি জামায়াতের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধের দাবি জানান। বলেন, “একাত্তরে যেমন জামায়াত মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তেমনই জাতীয় পার্টিও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। এদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা দরকার।”
উল্লেখ্য, ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রথমে সেনাপ্রধান এবং পরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হলেও বৈছা আন্দোলনের বিরোধিতার কারণে তাদেরকে সেখান থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এনসিপি যদিও বিতর্কিত স্লোগানের দায় অস্বীকার করেছে, তবুও বিতর্ক থামছে না। সোমবার দলের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই স্লোগানের দায় তাদেরকেই নিতে হবে’, যদিও স্পষ্টভাবে দায়ীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
