অর্থনীতি
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক আগেই তার সাজার রায় বাতিল করা হয়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে দায়ের করা শতাধিক মামলাও প্রত্যাহার করা হয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে রদ হওয়া কর অব্যাহতির সুবিধাও গ্রামীণ ব্যাংক ফিরে পায় ড. ইউনূস ক্ষমতারোহনের পরপরই।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার সরকারি বিধিমালা শিথিল করে ড. ইউনূসের আরেকটি প্রতিষ্ঠান- গ্রামীণ ট্রাস্টকে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চাকরি করা ড. ইউনূস এই ব্যাংককে কেন্দ্র করে একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তিনি নিজেই। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের সরাসরি কোনো সংযোগ না থাকলেও তলে তলে সম্পর্ক বজায় রয়েছে। ঢাকার মিরপুরের চিড়িয়াখানা সড়কের একটি ভবনে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় অবস্থিত।
এমনই একটি প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ টেলিকম, যা গ্রামীণফোনের এক-তৃতীয়াংশ শেয়ারের মালিক। গ্রামীণ ট্রাস্টও তেমনই একটি সংস্থা, যা দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থা ও সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। গ্রামীণ ব্যাংকের দর্শন অনুসরণ করে গ্রামীণ ট্রাস্ট বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থাগুলোকে আর্থিক, কারিগরি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা প্রদান করে।
বিশ্বজুড়ে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থপাচার রোধে সরকারি কড়াকড়ি রয়েছে। সরকার কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলার সংকটের কারণে নতুন অনুমতি দেওয়া বন্ধ ছিল। এর মধ্যেই নেপালের একটি প্রতিষ্ঠানে গ্রামীণ ট্রাস্টের শেয়ারকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এতে সরকারি বিধিমালা শিথিল করে ড. ইউনূসের আনুকূল্যে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।
জানা যায়, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার বিনিময়ে এক দশকের বেশি আগে নেপালের ক্ষুদ্রঋণদান প্রতিষ্ঠান নির্ধন উত্তান ব্যাংক লিমিটেডে এই শেয়ার পায় গ্রামীণ ট্রাস্ট। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর সম্প্রতি এই শেয়ারকে বিদেশি বিনিয়োগের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
গ্রামীণ ট্রাস্টের স্বীকৃতি পাওয়ার পর বর্তমানে দেশের বাইরে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪টিতে।
আফ্রিকার দেশ কঙ্গোর একটি প্রতিষ্ঠানেও একইভাবে শেয়ার পায় গ্রামীণ ট্রাস্ট। শিগগিরই সেটিও বিদেশি বিনিয়োগের স্বীকৃতি পেতে পারে বলে জানা গেছে। পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, কঙ্গো, ইয়েমেন, বলিভিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে গ্রামীণ ট্রাস্ট একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নেপালের উক্ত কোম্পানিতে গ্রামীণ ট্রাস্টের শেয়ার রয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ২৬৫টি বা ১.৫৬ শতাংশ, যার বাজারমূল্য ৪ কোটি ৬ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৩ নেপালি রুপি।
উল্লেখ্য, নির্ধন উত্তান ব্যাংক ১৯৯৮ সালে নেপালের কোম্পানি আইনের আওতায় লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৭ সাল থেকে এটি ব্যাংক ও ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট আইনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি এর নাম পরিবর্তন করে নির্ধন উত্তান লঘুবিত্ত বিত্তিয়া সংস্থা লিমিটেড (এনইউবিএল) করা হয়েছে। গ্রামীণ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ তাদের কৌশলগত জোটের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে।
অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা হিসেবে ১৯৮৯ সালে গ্রামীণ ট্রাস্ট যাত্রা শুরু করে। এক দশক আগে নেপালের নির্ধন উত্তান ব্যাংকের ২ লাখ ১৪ হাজার ২৫০টি বা ৩.৫৭ শতাংশ শেয়ার পায় এই সংস্থা। তবে এতদিন তা বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দাবি, আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যেই গ্রামীণ ট্রাস্টকে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এখানে দেশ থেকে কোনো অর্থ স্থানান্তর করা হয়নি।
২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দিয়ে আসছে। ২০২১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি বিধিমালা জারি করে। বিধিমালা অনুযায়ী, কেবল রপ্তানি আয় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোই বিনিয়োগের আবেদন করতে পারে। সর্বশেষ ৫ বছরের গড় রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অথবা সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের নিট সম্পদের ২০ শতাংশের মধ্যে যে পরিমাণ কম, সেই পরিমাণ বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়।
বিভিন্ন তথ্য ও সম্ভাব্যতা যাচাই, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি বিশ্লেষণসহ নানা বিষয় বিবেচনার পর গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত একটি বাছাই কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করে, এরপরই বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়।
১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করা গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে কর অব্যাহতি সুবিধা পেয়ে এলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় সেই সুবিধা বাড়ানো হচ্ছিল না। তার আগে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুসারে ড. ইউনূসকে অব্যাহতি দেওয়া হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে ব্যক্তিগত শত্রু বিবেচনায় নেন।
অন্যায্য বিবেচনায় ২০২১ সাল থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের কর অব্যাহতি সুবিধা বন্ধ করে দেয় শেখ হাসিনার সরকার। গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর দৃশ্যপট যায় বদলে। ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকেই আশীর্বাদধন্য করেননি ড. ইউনূস, তার প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘকাল ধরে যারা তার তল্পিবাহক ছিলেন, বেছে বেছে তাদেরকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে বড় বড় পদে। এমনকি নিজের পরিবার ও স্বজনরাও এই আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হননি।
সাধারণ মানুষ এজন্যই ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে এনজিওগ্রাম সরকার এবং ইউনূসের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে সরকারে-প্রশাসনে নিয়োগপ্রাপ্তদের ইউনূস-কোটা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
