বিশেষ প্রতিবেদন
জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সম্মেলনে তরুণদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। একজন ডিসির প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে এমন আলোচনা হয়। যার সত্যতা নিশ্চিত করলেন ড. ইউনূসের বিশেষ সহকারী আবদুল হাফিজ।
মঙ্গলবার তিন দিনের ডিসি সম্মেলনের শেষদিন রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।
আবদুল হাফিজ বলেন, ‘আমাদের যুব-সমাজের যারা আছেন তারা মিলিটারি ট্রেনিং পেতে পারেন, তারা দেশের প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। তবে এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার, এতে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা আছে, আমার মনে হয় এটা চিন্তা করতেই পারি। আমরা বলেছি, সরকারের নির্দশনা পেলে সশস্ত্র বাহিনী এটা করতে প্রস্তুত।’
তার এই বক্তব্য ইতিমধ্যে দেশের সচেতন মহলে ব্যাপক শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে ব্রিফ করছেন আবদুল হাফিজ
বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুসারে, বাংলাদেশের মত ছোট ও বিপর্যস্ত অর্থনীতির একটি ভূখণ্ডে সামরিক বাহিনীতে প্রায় ৫ লাখ, বিজিবি ও কোস্টগার্ডে প্রায় ১ লাখ, পুলিশ ও র্যাবে প্রায় সোয়া দুই লাখ এবং আনসার বাহিনীতে প্রায় ৬ লাখ সদস্য রয়েছে। এরপরেও কী এমন জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে আরও সশস্ত্র কিন্তু বেসামরিক বাহিনীর প্রয়োজন পড়ছে?
উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির বলেন, বিদেশি মদদে ইউক্রেনের ময়দান অভ্যুত্থানের পর সেখানকার সরকারবিরোধী অংশ মব ভায়োলেন্সে হাত পাকাতে পাকাতে সশস্ত্র গোষ্ঠী অ্যাজভ ব্যাটালিয়ন গড়ে তুলেছিল, যারা পরে মার্কিন অর্থায়নে ও প্রশিক্ষণে ভয়ানক দানবে পরিণত হয়। ঠিক সেভাবে বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্সে পেকে যাওয়া সমন্বয়কদের দিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী বানানোর পাঁয়তারা চলছে।
পড়ুন: ২৫০ জনকে অস্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুরু হলো প্যারা মিলিশিয়া বাহিনীর আদলে টাউন ডিফেন্স পার্টি
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এই অধ্যাপক উদাহরণ টেনে বললেন, ইতিমধ্যে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অধীনে ২৫০ জনকে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ‘টাউন ডিফেন্স পার্টি’ তথা শহর প্রতিরক্ষা দল হিসেবে। কাদের হাত থেকে তারা শহরকে প্রতিরক্ষা দেবে? পুলিশ নিধনের পর ট্রাফিক কন্ট্রোলে শিক্ষার্থীদের ঢোকানো হয়েছে, শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা তো আগের মতই রয়েছে। উল্টো একাডেমি থেকে প্রশিক্ষিত পুলিশদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাহলে নতুন করে কেন সশস্ত্র দানব চাইছি আমরা?
এই প্রবীণ অধ্যাপকের মত একই মত নেটিজেনদেরও। কাদের নিধন করতে সশস্ত্র যোদ্ধা তৈরির অভিপ্রায় সরকারের, এমন প্রশ্ন রেখেছেন অনেকেই। তবে জবাবও দিয়েছেন নেটিজেনরা। তাদের শঙ্কা, দেশে গৃহযুদ্ধ লাগানোর পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় হয়ত কোনো গোষ্ঠী। বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের পর যেভাবে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে বিরোধী মত পোষণকারী প্রতিপক্ষকে বেছে বেছে নিধন করা হয়েছে, একই পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিদগ্ধজন।
প্রসঙ্গত, ৫ই আগষ্ট শেখ হাসিনা দেশ না ছাড়লে গৃহযুদ্ধ শুরু হতো বলে গত বছরের ৩০শে অক্টোবর মন্তব্য করেছিলেন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় আহবায়ক ইসমাইল সম্রাট। এছাড়া, ২৭শে ডিসেম্বর ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফরহাদ মজহার বলেছিলেন, দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। এজন্য তিনি সাংবাদিকদেরও দুষলেন।
এর আগে, উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও বলেছিলেন অভ্যুত্থান সফল করার জন্য একটা সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা ছিল। সেজন্য তাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। তিনি একটি নোট রেখে গেছেন কয়েকজন সাংবাদিকদের কাছে। নাহিদ ছাড়াও, সমন্বয়কদের অনেকেই বারবার তাদের বক্তব্যে বলেছেন আওয়ামী লীগের দোসরদের প্রতিহত করতে প্রয়োজনে তারা সশস্ত্র লড়াই করবেন। তারা কোনো কিছুর পরোয়া করেন না। এজন্য তাদের অস্ত্রের যোগানও রয়েছে।
পড়ুন: জেল ভেঙে কত জঙ্গি পালিয়েছে, মুখ খুলছেন না দায়িত্বশীল কেউ
অস্ত্রের বিকল্প যোগান যে রয়েছে, তা প্রতিফলিত হয়েছে ডিসি সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আবদুল হাফিজের কথাতেও। তিনি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, থানায় আক্রমণের পর লুট হওয়া ১,৪০০ অস্ত্র এবং আড়াই লাখ বিভিন্ন ধরনের গুলি-গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি।
উল্লেখ্য, নরসিংদী কারাগারের বিশাল অস্ত্র ভাণ্ডার থেকে লুট হওয়া ভারী অস্ত্র-গোলাবারুদের অনেকটাই জঙ্গিদের হাতে চলে গেছে। ৪ঠা আগস্ট থেকে পরবর্তী কয়েকদিনে সারাদেশে সাড়ে চারশ’র বেশি থানা ধ্বংস করে দেওয়ার পর সেখান থেকে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে, তার বৃহৎ অংশ জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। গণভবন ও সংসদ ভবনে এসএসএফ-এর অনেক অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোয়েন্দা সরঞ্জাম, নিরাপত্তা সামগ্রী, স্পর্শকাতর অ্যাক্সেসরিজ কিছুই উদ্ধার হয়নি এখনও। যার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কে সংযোগকারী যন্ত্রপাতিও ছিল।
লুটকৃত অস্ত্রের কিছুটা মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যে। এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ আগস্টের পর থেকে সারাদেশ সহিংসতা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রশিক্ষিত জঙ্গিরাও এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দেশে নাশকতা ঘটাতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। এরমধ্যে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এ যেসব অস্ত্র উদ্ধারের কথা ছিল, তা হয়নি।
প্রতি মাসে গড়ে তিনশর বেশি মানুষ খুন হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ। সারাদেশে মব ভায়োলেন্স ভাইরাসের মত ছড়িয়ে গেছে। এর সাথে যদি বেসামরিক লোকজনও অস্ত্রশস্ত্র বহন করা শুরু করেন প্রশিক্ষণের পর, তবে দেশের শান্তি যে চিরতরে তিরোহিত হবে, সেই শঙ্কা অমূলক নয়। ইউক্রেনের অ্যাজভ ব্যাটালিয়ন দেশে শান্তি তো ফেরাতে পারেইনি, উল্টো রুশ ভাষাভাষী ইউক্রেনি নাগরিকদের ভিন্নমতামবলম্বী হিসেবে চিহ্নিত করে নিধন করেছে। বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার যদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়, এরমধ্যে জঙ্গিরাও প্রশিক্ষণের যে সুযোগ পাবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ইতিমধ্যে জেল ভেঙে শত শত জঙ্গি পালিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারকেও তাই সম্ভাব্য সবকিছু মাথায় রেখে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে ভেবে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন সচেতন মহল।
