নিজস্ব প্রতিবেদক
এ বছরের শুরুতে, গত কয়েক বছরের অভ্যাস অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম দিনেই বাংলাদেশের স্কুল শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে, ইউনুস প্রশাসনের অধীনে এবার এই নিয়ম ভেঙে গেছে। যদিও গত বছরগুলোতে শিক্ষার্থীরা নতুন বই পেয়ে আসছিল, এবার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও বই পৌঁছায়নি। এমন পরিস্থিতিতে, শিক্ষা খাতের এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ বছর পাঠ্যবই ছাপানোর খরচ ৭৫০ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে, অথচ এখনও প্রায় ১৮ কোটি বই ছাপা বাকি। তবে, এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বইয়ের ছাপার কাজ চলছে, তবে প্রচুর প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং কর্মী সংকটের কারণে সময়সীমা দীর্ঘতর হচ্ছে। বর্তমানে ছাপাখানাগুলোর ক্ষমতার চেয়ে বেশি বইয়ের কাজ দেওয়া হয়েছে, তাই ছাপা হয়ে আসতে সময় নিচ্ছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একেএম রিয়াজুল হাসান জানিয়েছেন, ‘এ পর্যন্ত ২৪ কোটির বেশি বই ছাপা হয়েছে, তবে বাঁধাইকর্মীর সংকটের কারণে তিন কোটি বই আটকে রয়েছে।’ তিনি আরো জানান, ‘ছাপাখানাগুলো প্রতিদিন ৪০ লাখ বই ছাপতে পারছে। তবে, বাঁধাইয়ের কাজে আরো সময় লাগবে।’
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি ছাপাখানা তাদের নিজস্ব ক্ষমতার চেয়ে বেশি কাজ পেয়েছে, এবং এখন এনসিটিবি তাদের এই ছাপাখানাগুলোকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সহযোগিতা করার সুযোগ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ৪-৫টি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু হয়েছে। তবে, অনেক প্রতিষ্ঠানই অতিরিক্ত কাজ পেয়ে চাপের মধ্যে রয়েছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বই ছাপানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রথম থেকেই সমস্যা ছিল। অনেক ছাপাখানার মালিকরা জানিয়েছিলেন যে, তারা দৈনিক ১ কোটি ৪২ লাখ বই ছাপাতে পারবেন, কিন্তু বাস্তবে তাদের সক্ষমতা ছিল ৪০ লাখের মতো। এক্ষেত্রে, এনসিটিবি কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যাপারে কঠোর শর্তারোপ করা হবে।
এছাড়া, দেশে কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ার এবং বাঁধাইকর্মীর অভাবের কারণে ছাপাখানাগুলোর কাজের গতি কমে গেছে। মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান জানিয়েছেন, “বই ছাপানোর জন্য কাগজের সংকট ও বাঁধাইকর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। তবে, এখন কাজ কিছুটা দ্রুত এগোচ্ছে এবং মার্চের মধ্যে সব বই ছাপা শেষ হবে।”
এছাড়া, এবারে পাঠ্যবই ছাপানোর পাশাপাশি ‘নোট-গাইড’ বইয়ের ক্ষেত্রে কিছু ছাপাখানা মালিক বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, যা নিয়ে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। তারা জানিয়েছেন, কিছু ছাপাখানা ‘নোট-গাইড’ বই ছাপানোর জন্য পাঠ্যবইয়ের কাজ ধীরগতিতে চালাচ্ছে, এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান রিয়াজুল হাসান জানিয়েছেন, “আমরা এখন পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য নতুন উদ্যোগ নিচ্ছি, এবং আগামীতে এই বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” এছাড়া, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৪০ কোটি বই ছাপানোর কাজ চলছে, যার মধ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশেষভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক বইও ছাপা হচ্ছে।
এ সময়, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা হতাশা প্রকাশ করেছেন, কারণ তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীরা তাদের বই না পেয়ে শিক্ষামূলক কার্যক্রমে পিছিয়ে পড়ছে। এবারের পরিস্থিতি সরকারের শিক্ষা খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে, এবং দ্রুত এই সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। স্কুল থেকে বলা হচ্ছে এনসিটিবি’র ওয়েবসাইট থেকে বই এর সফটকপি নামিয়ে পড়ার জন্য। অনেক স্বচ্ছল অভিভাবক, বই ডাউন লোড করে প্রিন্ট করিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সবার সেই অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকার কারনে সন্তানদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
ইতিমধ্যে রোজার আগেই স্কুল গুলো ক্লাস টেস্ট সহ ১ম সাময়িকী পরীক্ষা শেষ করতে চাচ্ছেন, না হলে সিলেবাস কাভার করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন স্কুলের শিক্ষকরা। কিন্তু ক্লাসে অনেকেরই বই না থাকবার কারনে সেই ব্যাবস্থা নিতে পারছেন না শিক্ষকরা। তারা মনে করছেন পরীক্ষার শিডিউল মেনে চললে, বই না থাকবার কারনে অনেক ভালো কিন্তু অস্বসচ্ছল ছাত্রদের রেজাল্ট খারাপ হতে পারে।
এদিকে, এনসিটিবি কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়েছেন, তারা ফেব্রুয়ারির মধ্যেই বই বিতরণের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন।
