কবির য়াহমদ
৫ই আগস্ট দিনের তৃতীয় প্রহরের আগ পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারিনি আওয়ামী লীগ সরকারের গত-পর্বের শেষ দিন ওটি। জানলাম সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ জামানের ভাষণের মাধ্যমে। অথচ দেখুন, জুলাইয়ের শেষাংশ থেকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-এমপি-মন্ত্রী দেশ ছাড়ছিলেন।
তারা কি শঙ্কায় ছিলেন, নাকি ইঙ্গিত পেয়েছিলেন?
উত্তর হয়ত দ্বান্দ্বিক কোনো; তাই হ্যাঁ বা না বলা কঠিন!
তাহলে দেশ ছাড়ার কারণ কী ছিল? একটা উত্তর হতে পারে আওয়ামী লীগের পূর্বপ্রস্তুতি! উত্তাল দেশ সত্ত্বেও প্রস্তুতির বিষয় না থাকলে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিদেশ গমনে গ্রিন সিগন্যাল মিলত না নিশ্চিতভাবে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন চলে যাওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ করে আসছিল ষড়যন্ত্রের দাবি। সরকার পতনই এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য এমনটাও বলছিল তারা। এর সঙ্গে পশ্চিমা দেশের যোগও যুক্ত করে দিচ্ছিল প্রতি কথায়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলছিলেন, অনেকেই তাদেরকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। বারবার ইঙ্গিত করা হচ্ছিল আমেরিকার দিকে। বলা হচ্ছিল সেন্ট মার্টিন নিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা। সরকারের প্রভাবশালী অনেক মন্ত্রীও বলছিলেন ষড়যন্ত্রের কথা।
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন থাকা দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা দল হয়ত সরকারকে সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিল, সেজন্যে বুঝি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতিতে একে একে অনেকের নিরাপদ দেশ ত্যাগ নিশ্চিত করছিল সরকার। এরআগে সফর সংক্ষিপ্ত করে চীন থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ইঙ্গিতের কথাই বলে।
সবাইকে এক সঙ্গে দেশের বাইরে পাঠানোর বিষয়টি অসম্ভব ছিল বলে, যারা দেশে ছিল তাদের উল্লেখযোগ্যদের নিরাপদ প্রস্থানের পথও করে রেখেছিল সরকার। ফলে দেখা যায়, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান কামালসহ অনেক মন্ত্রী সরকার পতনের পর দীর্ঘদিন দেশে থাকলেও পরে তারা দেশ ত্যাগ করতে সমর্থ হন। এছাড়া সরকারের অনেক মন্ত্রী-এমপি সেনা হেফাজতে থাকার কথাও আমরা নানা মাধ্যম সূত্রে জেনেছিলাম, যাদের বেশিরভাগই গ্রেপ্তার হননি।
গ্রেপ্তার হয়েছেন যারা, তাদের অনেকেই বিতর্কিত। এদের সবাই যদি ইউনূস-সরকার আয়োজিত বিচার প্রক্রিয়ায় শাস্তিও পান, তবু আওয়ামী লীগের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। বরং আওয়ামী লীগ লাভবান হবে। তারা জনপরিসরে একদিকে সরকারের প্রতিহিংসার রূপ দেখাবে, অন্যদিকে বলবে আওয়ামী লীগের দোষী যারা তাদের বিচার হয়ে গেছে।
৫ই আগস্ট আন্দোলনকারীদের ঢলের বিপরীতে কিছুই করার ছিল না গণভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের। তবু এখানেও ছিল প্রস্তুতির প্রমাণ। শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ, বাংলাদেশের আকাশসীমা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল প্রদান, ভারতের আকাশসীমায় দেশটির প্রটোকল প্রদান নজিরবিহীন হলেও বাস্তবতা। এরপর ভারত শেখ হাসিনাকে সর্বদলীয় বৈঠক করে রেখেছে তাদের রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে। এখনও তিনি আছেন ওখানে ওভাবেই।
সরকার পতনের পর সারাদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক হারে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, নেতাকর্মীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে সত্য, তবে এই দুর্দিনেও ফিরে আসার পথ করে রেখেছে দল। এটা অনেকটা প্রস্তুতি নিয়েই বলে মনে হচ্ছে। এখনই হয়ত অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকলেও সময়ে-সময়ে প্রস্তুতির বিষয়ের প্রমাণ হতে থাকবে।
খেয়াল করলে দেখবেন, পাঁচ মাসেও দেশে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে না। মাঠের কর্মসূচি নিয়ে এখনো কোন চিন্তা করছে না। এটা মূলত কৌশলের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ চাইছিল তাদের বিরুদ্ধে যে সর্বদলীয় ঐক্য গড়ে ওঠেছিল সেখানে ভাঙনের। ইউনুস সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই আওয়ামী লীগ যদি কোথাও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করত, তবে আওয়ামী লীগবিরোধী সকল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের দমনেই মাঠে থাকত। এতে তাদের মধ্যকার ঐক্য সুদৃঢ় থাকত। গোপালগঞ্জের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা প্রমাণ এর।
আওয়ামী লীগ চুপ। এতে আওয়ামী লীগবিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তির দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে আওয়ামী লীগ আর ফিরবে না। ফিরতে পারবে না। ফিরতে দেওয়া হবে না। ফলে তাদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত বেড়েছে। তারা একে অন্যের পিছু লেগেছে। তাদের স্বার্থের সংঘাত তীব্র হওয়ার অপেক্ষায় এখন রয়েছে আওয়ামী লীগ।
বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্ব, বিএনপি-বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের দ্বন্দ্ব, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও অন্যদের দ্বন্দ্ব ক্রমে তীব্র হচ্ছে। আওয়ামী লীগ মাঠে থাকলে এটা এভাবে দৃশ্যমান হতো না। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মার খাচ্ছে, আর মার খেয়ে তারা আদায় করতে চাইছে বৈশ্বিক সমর্থন, পাশাপাশি দেশের মধ্যে থাকা গণক্ষোভ প্রশমনে করছে মজলুমের ভাবপ্রকাশ।
মাঠছাড়া আওয়ামী লীগ, এটা যেমন কৌশল; তেমনি কৌশল জুলাই-আগস্টে নেতা-মন্ত্রীদের নিরাপদ প্রস্থান। সরকারের ব্যর্থতা তাদের কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা ছিল, চাওয়া ছিল আগস্ট-বেনিফিসিয়ারিদের কামড়াকামড়ি; এবং এ-দুই চাওয়া তাদের পূরণের পথে। ফলে ফিরতে পারবে না বলে যে ধারণা বদ্ধমূল, সেটা উপেক্ষা করে দলবল নিয়ে ফিরে আসতে চাইবে তারা। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে তিন দলে দলে-দলে আসবে তারা। অগ্রবর্তী দল দেশে এসে কিছু কর্মসূচি ও গ্রেপ্তার বরণ করে হুলস্থূল কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারে। নেতারা তো স্ট্যান্ডবাই!
আওয়ামী লীগের অপেক্ষা নির্বাচনের তফসিলের। নির্বাচনে তাদের অংশ নিতে দিতে চায় না ইউনূস-সরকারসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গোত্রীয়রা। তাদের এ অবস্থানই হতে পারে আওয়ামী লীগের তুরুপের তাস। সারাবিশ্বের, বিশেষ করে বৈশ্বিক মোড়লদের লক্ষ্য থাকে মোড়লিপনা ও চোখ থাকে নির্বাচনের দিকে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন–বহুল চর্চিত এ শব্দযুগল ব্রহ্মাস্ত্র হতে পারে ভবিষ্যৎ রাজনীতির!
সংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
Visited 423 times, 1 visit(s) today