নিজস্ব প্রতিবেদক
টেকনাফের সাবরাং এলাকায় গত ২২শে নভেম্বর রাত দেড়টায় অভিযান চালিয়ে র্যাব-১৫ একটি পরিত্যক্ত জায়গা থেকে ৪টি ট্যাংক বিধ্বংসী তাজা ৪০ মিমি রকেট হিট এবং ৪টি ফিন অ্যাসেম্বলি উদ্ধার করে।
এমন ভয়াবহ সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা দেশের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন র্যাবের কক্সবাজার শাখার সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান। রকেট এবং ফিন অ্যাসেম্বলি ধ্বংস করার কাজ সম্পন্ন করার কথা রামু সেনানিবাসের বোম্ব ডিসপোজাল টিমের। যদিও এই অস্ত্র উদ্ধারের পর থেকে এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি এসবের সাথে কারা জড়িত কিংবা কোথা থেকে এসেছে, এ নিয়েও কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত সংবাদ
র্যাব জানিয়েছিল, ওইদিন উত্তরপাড়া মাঝের ডেইল এলাকায় কিছু অসাধু অস্ত্র ব্যবসায়ী অত্যাধুনিক অস্ত্রের একটি চালান বিক্রির উদ্দেশ্যে অবস্থান করার খবর পাওয়া যায়। পরে র্যাবের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দু-তিন জন দৌড়ে পালাায়। র্যাব সদস্যরা ধাওয়া দিলেও কাউকে আটক করতে পারেনি।
তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, সাধারণ অস্ত্র ব্যবসায়ীরা কেন এই সামরিক গ্রেডের অস্ত্র এভাবে বিক্রি করবে? ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র তো সাধারণ সন্ত্রাসীদের হাতের জিনিস নয়, এসব ব্যবহার করতে হলে দীর্ঘ সামরিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এছাড়া বৃহৎ জঙ্গি সংগঠনগুলোও এসব ব্যবহার করে।
তবে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত সেই সংবাদের ওপর বিশদ অনুসন্ধান চালায় ট্রু গেজেট নামক একটি সংস্থা। তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংস্থাটি জানায়, এই ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্রটি তৈরি হয়েছে করাচিতে রাষ্ট্রীয় পাকিস্তান মেশিন টুল ফ্যাক্টরিতে (পিএমটিএফ)। প্রযুক্তিটি মূলত ১৯৬১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে উদ্ভাবিত। কক্সবাজারে উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো মূলত পাকিস্তানে তৈরিকৃত।
সংস্থাটি মার্কিন এয়ারফোর্স জাদুঘরের বরাতে জানায়, দক্ষিণ এশিয়ায় শুধুমাত্র পাকিস্তানে এই অস্ত্র তৈরি হয়।

রকেটগুলো বাংলাদেশের টেকনাফে কীভাবে পৌঁছালো, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দুই মাসেও জানা যায়নি কোনো উত্তর।
প্রসঙ্গত, টেকনাফে ট্যাংক বিধ্বংসী এই রকেটগুলো উদ্ধারেরর ঘটনার মাত্র ৫ দিন আগে, ১৬ই নভেম্বর, পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ আসে। যাতে শিল্পের কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য থাকার কথা থাকলেও কোনো কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই পণ্য খালাস করা হয় যথাযথ গোপনীয়তা বজায় রেখেই।
পড়ুন: ইন্সপেকশন শতভাগ তুলে নেয়ার পরে পাকিস্থান থেকে প্রথম জাহাজের আগমন, আসবে পাকিস্থানি বিমানও
কার্গো মেনিফেস্টে দাবি করা হয়েছে, কন্টেইনারগুলোতে শিল্পখাতের প্রয়োজনী রাসায়নিক, যেমন সোডিয়াম কার্বনেট, ডলোমাইট, চুনাপাথর ইত্যাদি ছাড়াও কাপড়, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য ছিল।
পড়ুন: পাকিস্তানী জাহাজের দুটি কন্টেইনারে ‘ভয়ঙ্কর বিস্ফোরক’ দ্রব্য আসার তথ্যফাঁস!
চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উক্ত জাহাজটি প্রধানত পরিশোধিত চিনি, খনিজ ডলোমাইট, সোডা অ্যাশ, কাপড়ের রোল, পুরোনো লোহার টুকরা এবং আখের গুড়ের মতো পণ্য নিয়ে এসেছে। জাহাজে করে পাকিস্তান ছাড়াও আরব আমিরাত থেকে খাদ্যপণ্য, লুব্রিক্যান্ট অয়েল এবং যন্ত্রাংশ এসেছে। এছাড়া দৈনিক প্রথম আলো’র বরাতে জানা যায়, একটি কন্টেইনারে ছিল হুইস্কি, ভদকা এবং ওয়াইন।
পড়ুন: মদ, কাচভাঙাসহ আরও যা কিছু ছিল পাকিস্তান থেকে আসা সেই জাহাজে
যদিও বিডি ডাইজেস্ট-এর হাতে আসা তথ্য ও ছবি অনুযায়ী জানা গেছে, পাকিস্তানি জাহাজের দুটি কন্টেইনারে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরক দ্রব্য পাওয়া যায়। একটি কন্টেইনারে লাল রঙের বর্গাকার লেবেলে ‘এক্সপ্লোসিভ’ লেখা ছিল। সেই বিস্ফোরক দ্রব্যের ধরণ টেকনাফে উদ্ধার হওয়া রকেটের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

কন্টেইনার থেকে খালাস করা হচ্ছে বিস্ফোরক
এরমধ্যে ডব্লিউএইচএলইউ-৪২৬১৭৯৪২জি১ নামে একটি কন্টেইনারের ছবি পাওয়া গেছে, যেখানে লাল বর্গাকৃতি মার্কিংয়ের মধ্যে ‘এক্সপ্লোসিভ(বিস্ফোরক)’ লেখা।
চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার খোলার সময় নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বিস্ফোরক দ্রব্য দেখে এক ঘণ্টার জন্য আটকে রাখলেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পণ্য খালাস করা হয়। উল্লেখ্য, কন্টেইনারগুলোর মধ্যে একটি ক্যাম্বোডিয়ান প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত সিসমিক ইমালশন এক্সপ্লোসিভ ছিল, যা বড় মাত্রার স্থাপনা ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত হয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
পড়ুন: “বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের পাকিস্তানি পণ্য আমদানিতে বাধ্য করা হচ্ছে”
বিবরণ অনুযায়ী, পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসা ‘এমভি ইউয়ান জিয়াং ফা ঝং’ জাহাজটি সরাসরি পাকিস্তান থেকে আরব আমিরাত হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছায়। যদিও কন্টেইনার মেনিফেস্টে বিস্ফোরক দ্রব্যের কোনো উল্লেখ ছিল না, তবুও পণ্য খালাসের পর সন্দেহজনক কার্যক্রম লক্ষ্য করা গেছে।

পুরো কন্টেইনার ভর্তি বিস্ফোরকের কার্টন
সূত্র জানায়, এই বিস্ফোরক দ্রব্যের একটি অংশ সিলেট এবং আরেকটি অংশ কেরাণীগঞ্জে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিপজ্জনক দ্রব্য আমদানির জন্য বিশেষ প্রটোকল থাকা সত্ত্বেও এই কন্টেইনারগুলোতে সেই প্রটোকল মানা হয়নি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দ্রুত পণ্য খালাস এবং ঘটনাস্থল ত্যাগ করা হয়েছে।

টেকনাফে উদ্ধারকৃত ট্যাংক বিধ্বংসী রকেটের ফিন অ্যাসেম্বলির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বিস্ফোরক
প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত এই ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র বাংলাদেশে কীভাবে এল? কারা আনল, কেন আনল? আর কেনই বা এ বিষয়ে তদন্ত বন্ধ হয়ে গেল?
পড়ুন: জঙ্গী মেজর জিয়ার দায়মুক্তিতে ইউনূস সরকারের অবস্থান: নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান অবশ্যম্ভাবী। ৫ই আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন কারাগার ভেঙে পালিয়েছে ভয়ংকর জঙ্গিরা, অনেকের মামলা খারিজ করে বের করে আনা হয়েছে। এছাড়াও সেনাবাহিনী থেকে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার জন্য বহিষ্কৃত কয়েকজন পলাতক জঙ্গির ওপর থেকে সকল অভিযোগ প্রত্যাহারপূর্বক মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদানের আবেদনও করা হয়েছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে।
এ ঘটনাগুলো বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণামধ্যম।
সংযুক্তি:
ঝিনাইদহে ফসলের মাঠ থেকে ‘আর্জেস গ্রেনেড’ উদ্ধার
গতকাল বুধবার ৮ই জানুয়ারি দুপুরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাড়িবাথান গ্রামের চরপাড়া মাঠ থেকে একটি এম৩৬ মডেলের আর্জেস গ্রেনেড উদ্ধার করেছে ঝিনাইদহ র্যাব-৬। সংস্থার কোম্পানি কমান্ডার মেজর নাঈম আহমেদ জানান, চরপাড়া মাঠে একটা গ্রেনেড পড়ে আছে খবর পেয়ে র্যাব সেটি উদ্ধার করে। পরে র্যাবের বোম ডিসপোজাল ইউনিট গ্রেনেডটি ওই মাঠের ভেতরে ধ্বংস করে।
তবে গ্রেনেডটি কে বা কারা এখানে রেখে গেছে সেটি জানাতে পারেনি। অভিযানে র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছিল সেদেশে উৎপাদিত কয়েক বক্স আর্জেস গ্রেনেড।
