চট্টগ্রামে ট্রাকের সামনে লাইন ভোর থেকে, চাল সরবরাহ বন্ধ

চট্টগ্রামে ট্রাকের সামনে লাইন ভোর থেকে, চাল সরবরাহ বন্ধ
শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম নগরীর আমবাগান এলাকার বাসিন্দা ফরিদা আক্তার ফজরের নামাজের পর টিসিবির পণ্য কেনার জন্য ট্রাকের সামনে সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন। সকাল ৭টার পর কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারলেও চাল পাননি।

ফরিদা বলেন, “এলাকার কয়েকজন মিলে এসেছি। একবার বাড়িতে গেছি, পরে আবার এসে তেল আর ডাল কিনেছি। কিন্তু চাল নেই। ট্রাকের লোকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা বলল চাল নেই, শুধু তেল আর ডাল আছে।”

টিসিবির বিক্রয়কর্মী মোবারক জানান, ট্রাকে চাল দেওয়া হয় না। তারা যা পণ্য পান, তা-ই বিক্রি করেন। যতক্ষণ পণ্য থাকে, ততক্ষণ বিক্রি করা হয়।

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন ট্রাক সেল পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকেই নানা বয়সী নারী-পুরুষ লাইনে দাঁড়ান। কেউ কেউ পাঁচ-সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আগেও এসে লাইনে দাঁড়ান, তবু সবাই পণ্য কিনতে পারেন না। চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে টিসিবির ট্রাক থেকে আর চাল বিক্রি করা হচ্ছে না।

টিসিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের যুগ্ম পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, খাদ্য অধিদপ্তরের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করেই তারা বিক্রি করেন। কিন্তু চাল না পাওয়ায় বিক্রিও বন্ধ রয়েছে।

তবে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন জানিয়েছেন, চালের কোনো ঘাটতি নেই। টিসিবি চাহিদাপত্র পাঠালে তারা সরবরাহ করতে প্রস্তুত।

এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সরকারি গুদামে চালের মজুদ অর্ধেকে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভর করছে। ভারত থেকে নিয়মিত চাল আসার পাশাপাশি এবার মিয়ানমার থেকেও চাল আমদানি হচ্ছে। ধান-চালের এই সংকটকে কেউ কেউ দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।

চট্টগ্রাম নগরীর চেরাগী পাহাড় এলাকায় টিসিবির পণ্য বিক্রি হয় সপ্তাহের দুই দিন—শনিবার ও মঙ্গলবার। জামালখান মোড়ে বিক্রি হয় সোমবার ও বৃহস্পতিবার। নগরীর মোট ২০টি পয়েন্টে সপ্তাহে দুই দিন করে পণ্য বিক্রি করা হয়।

টিসিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক আব্দুল কুদ্দুছ জানান, প্রতিটি পয়েন্টে প্রতিদিন ৪০০ জন ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করা হয়। ফলে প্রতিদিন মোট ৮,০০০ মানুষ টিসিবির পণ্য কেনার সুযোগ পান। ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে, আগে প্রতি ট্রাকে ৩৫০ জন ক্রেতার জন্য পণ্য বরাদ্দ থাকলেও এখন তা বাড়িয়ে ৪০০ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা থেকেও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।

মঙ্গলবার সকাল ১১টায় নির্ধারিত সময়ে চেরাগী পাহাড়ে টিসিবির ট্রাক পৌঁছালে বিক্রয়কর্মীরা প্রথমে ডালের প্যাকেট তৈরি করতে শুরু করেন। এ কারণে পণ্য বিক্রি শুরু হতে ৪০ মিনিট দেরি হয়।

এসময় সুমিত দে নামের এক ক্রেতা বলেন, “বাজারের চেয়ে ট্রাকে তেলের দাম কম, আর ডালের মানও ভালো। তাই ৪-৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মানুষ কিছু টাকা বাঁচানোর চেষ্টা করে। তবে চাল দিলে আরও ভালো হত।”

দীর্ঘ লাইনে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী মানুষ ক্লান্ত হয়ে কেউ ফুটপাতে বসে পড়ছেন, আবার কেউ পরিবারের অন্য সদস্যকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে বাসায় চলে যাচ্ছেন।

সোমবার জামালখান মোড়ে কথা হয় ক্রেতা মোসাদ্দেক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আগে ফ্যামিলি কার্ড দেখিয়ে পণ্য দেওয়া হত। তখন কার্ড ছাড়া কেউ পণ্য কিনতে পারত না। এখন কার্ড লাগে না, তাই লাইন আরও বড় হয়। সবাই কিনতে পারে না। তাছাড়া গাড়ি আসতে দেরি হয়, আর অনেকে জানেই না, কোন দিন গাড়ি আসবে। এজন্য অনেক সময় অন্যদিনও এসে ঘুরে চলে যায়।”

দুটি পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, নিম্ন আয়ের মানুষ যেমন গৃহকর্মী, রিকশা ও অটোরিকশা চালক, শ্রমিক, দিনমজুর এবং দোকানকর্মীদের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারের বয়স্ক সদস্যরাও লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনছেন।

চট্টগ্রামে ফ্যামিলি কার্ড ছাড়া টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু হয় গত ২৪ অক্টোবর থেকে। শুরুতে এই কার্যক্রম ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

টিসিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক আব্দুল কুদ্দুছ জানান, শুরুতে প্রতিটি ক্রেতার কাছে ১০০ টাকা লিটার দরে ২ লিটার তেল, ৬০ টাকা কেজি দরে ২ কেজি মসুর ডাল এবং ৩০ টাকা কেজি দরে ৫ কেজি চাল বিক্রি করা হচ্ছিল। তবে তিনি বলেন, “১ ডিসেম্বর থেকে টিসিবির ট্রাকে চাল বিক্রি বন্ধ রয়েছে।”

টিসিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের যুগ্ম পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা খাদ্য অধিদপ্তর থেকে চাল সংগ্রহ করে বিক্রি করি। কিন্তু চলতি মাসে খাদ্য অধিদপ্তর থেকে চাল বরাদ্দ পাইনি। ১,০০০ টন চাল বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দিয়েছি, তবে এখনো কোনো চাল আসেনি।”

অন্যদিকে, “চালের কোনো সংকট নেই” দাবি করে চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন বলেন, “আমাদের কাছে পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে। টিসিবি যদি চাহিদাপত্র (ডিও) পাঠায়, আমরা চাল সরবরাহ করব। কিন্তু এখনো কোনো চাহিদাপত্র পাইনি। কোথাও তথ্য বিভ্রাট হচ্ছে। চাহিদা পেলে আমরা অবশ্যই চাল সরবরাহ করব।”

খাদ্য নিয়ন্ত্রকের মতে, ১,০০০ টন চাল বরাদ্দ পেলে চট্টগ্রামের ২০টি পয়েন্টে প্রায় এক মাস চাল বিক্রি করা সম্ভব হবে।

Visited 30 times, 1 visit(s) today