অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১০০ দিন: ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১০০ দিন: ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট।
শেয়ার করুন

ঢাকা, ১৯শে নভেম্বর, ২০২৪- বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেখা যাচ্ছে একাধিক রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক দলীয়করণ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর চাপ বিদ্যমান রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১০০ দিন শীর্ষক তাদের একটি প্রতিবেদনে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং চ্যালেঞ্জসমূহ বিশ্লেষণ করেছে, যেখানে সরকারের শাসনব্যবস্থার দিক থেকে বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও অস্বচ্ছতা সামনে এসেছে।

গতকাল ১৮ই নভেম্বর মেঘমালা, টিআইবি থেকে “নতুন বাংলাদেশ এর ১০০ দিন” শীর্ষক এই প্রতিবেদন পাথ করেন সংস্থাতির নির্বাহী পরিচালক ড ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী ববস্থাপক অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, ও পরিচালক মো বদিউজ্জামান।

প্রথমত, টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা এবং জটিলতা লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচন কমিশন, দুদক, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের সংস্কারের জন্য গঠন করা কমিশনগুলোর কার্যক্রম চলাকালীন অব্যবস্থাপনা এবং চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অ্যাডহক প্রবণতা এবং নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রবল হয়ে ওঠে, যার ফলে জনশক্তি নিয়োগ, প্রশাসনিক পদায়ন, এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা পরিবর্তন বা পর্যালোচনা করা হয়েছে, যা সরকারী কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা ইস্যুতেও সরকারের পদক্ষেপ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে আক্রমণ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠে। একাধিক গণমাধ্যমের ওপর হুমকি-হামলা এবং সরকারি প্রক্রিয়ায় অ্যাক্রিডিটেশন বাতিলের ঘটনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়েছে। নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও কিছু ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে, যা একান্তভাবে সরকারের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এছাড়া, জনপ্রশাসনে দলীয়করণের ব্যাপক প্রসার দেখা গেছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা এবং মন্ত্রণালয়ে পদায়নের দেরি পরিলক্ষিত হয়েছে, যার ফলে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও প্রভাবিত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। পুলিশ বাহিনীর অবহেলা এবং দায়িত্ব পালনে অনীহা দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, গণপিটুনি, এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির দিকে নিয়ে গেছে। শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, এবং সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমের অভাব আইনপ্রণয়নে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ বেড়ে গেছে, যা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার শীর্ষস্থানীয় ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া ছাত্র-জনতার ওপর হামলাকারী, হত্যার ইন্ধনদাতা ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ১,৬৯৫টি মামলা করা হয়েছে, এবং এসব মামলায় ৩,১৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে (১৩ অক্টোবর পর্যন্ত), যাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ৭৪ জন।

ক্ষেত্রবিশেষে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করা হচ্ছে, এবং মামলায় ঢালাওভাবে আসামী হিসেবে নাম দেওয়া হচ্ছে। এসব মামলার ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে পূর্বশত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা এবং চাঁদাবাজি ও হয়রানি করতে অনেককে আসামির করা হচ্ছে, আবার অব্যাহতি দেওয়ার নামে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরকার পতনের পর সারা দেশে ছয় শতাধিক নিহত ও ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। গণপিটুনির ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে বলে লক্ষ করা যায় – গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ৬৫ জনের। বিভিন্ন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে ৯০ জন শ্রমিক নিহত হয়েছে। এছাড়া চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই বৃদ্ধি পেয়েছে। সারা দেশের নয়টি কারাগারে বিক্ষোভ ও সহিংসতায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছে, অনেক বন্দী পালিয়ে গেছে যাদের একটি অংশকে এখনো আটক করা যায়নি। শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা দেখা গেছে। বকেয়া বেতন পরিশোধ ও অন্যান্য দাবি-দাওয়া নিয়ে তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্প-কারখানায় বিক্ষোভ-আন্দোলন হয়েছে। গাজী টায়ার কারখানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগে মৃত্যু ও নিখোঁজ কমপক্ষে ১৭৫ জন।

এছাড়া সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক সহিংসতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মৃত্যু হয়েছে, এবং ঘরবাড়ি, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী (সুব্রত বাইন, ‘পিচ্চি হেলাল’, ‘কিলার আব্বাস’) কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের অপরাধমূলক তৎপরতায় জড়িত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২,০১০টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছে যেখানে ৯ জন নিহত হয়েছে; অন্যদিকে একটি সংবাদপত্রের হিসাব অনুযায়ী ১,০৬৮টি স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০টির বেশি মাজারে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, যেসব ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দেশের ২২টি জায়গায় শিল্পকলা একাডেমিতে হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে; প্রতিবাদের মুখে শিল্পকলায় নাটকের প্রদর্শনী বন্ধ করতে হয়েছে। এছাড়া মেলা আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

আইন বিভাগেও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ ও বিচারকদের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে চলমান মামলা এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার এবং তদন্তের বিষয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রশাসনিক অস্থিরতা, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের কার্যক্রমে কিছু সফলতা থাকলেও, শাসনব্যবস্থার আধিকারিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় অবহেলা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে।

Visited 53 times, 1 visit(s) today