অর্থনীতি
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আবারও গভীর সংকটে নিমজ্জিত। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে, বাজারের সূচক টানা নিম্নমুখী, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন ভীতির জন্ম দিয়েছে। ২০১০ সালের মহাধস থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এ সংকটের মাত্রা কেবল বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ উপেক্ষা করে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল নীতি কাঠামো এই অবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৫ই আগস্টের পর মাত্র চার কর্মদিবসের সূচক বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সেই উত্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাজারে অস্বাভাবিক পতন শুরু হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নেওয়া কিছু পদক্ষেপ এই সংকটের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সম্প্রতি ২৭টি কোম্পানিকে জেড শ্রেণিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন ভীতির জন্ম দিয়েছে। এক বিনিয়োগকারী বলেন,
কোম্পানিগুলোর দোষে আমাদের কেন শাস্তি পেতে হবে? শেয়ারের দর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
বিনিয়োগকারীদের এই ক্ষোভ থেকেই বোঝা যায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে।
বেক্সিমকো লিমিটেডসহ কিছু কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচায় কারসাজির অভিযোগে ৯ জন বিনিয়োগকারীকে প্রায় ৪২৮ কোটি টাকার জরিমানা করা হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যক্তিগত বড় বিনিয়োগকারীদের ব্যাংক ও বিও হিসাব অবরোধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত। বাজারের ওপর এর প্রভাব ইতিবাচকের বদলে নেতিবাচক হয়েছে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেইন সিদ্দিকী বলেন
বাজারে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি তালিকাভুক্তির সমস্যা দীর্ঘদিনের। এসব কোম্পানি বাজার থেকে পুঁজি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাহত করেছে।
তিনি আরও যোগ করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন কারসাজি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা নষ্ট করছে।
ইনসাইডার ট্রেডিং এবং শেয়ারের মূল্য কারসাজি দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এক বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন,
কারসাজি চক্র ধরতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। জরিমানা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না, জেল দিতে হবে।
বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দাবি করেছেন,
আমরা বাজারে কোনো রুটিন হস্তক্ষেপ করছি না। তবে কোনো অনিয়ম দেখলেই আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কিন্তু বিনিয়োগকারীদের মতে, এই আশ্বাস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ।
বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি, এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের অভাব বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর একটি অংশ।
মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ফান্ড, এবং করপোরেট বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ পুঁজিবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে এই খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত কম। বিএমবিএ সভাপতি মাজেদা খাতুন বলেন,
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে হলে বাজারের নীতি কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে।
তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানি বাজার থেকে পুঁজি তোলার পর আর্থিক কারসাজি এবং মুনাফা লোকসানের দোহাই দিয়ে বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করেছে। এতে করে বাজারের স্বচ্ছতা এবং আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
২০২০ সালের কোভিড মহামারীর পর শেয়ার বাজারের কিছুটা উত্থান হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই সময় বাজারের প্রকৃত সম্ভাবনার চেয়ে কারসাজি চক্র বেশি সক্রিয় ছিল।
৫ই আগস্টের পর বাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাজারের এই অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে।
উত্তরণে করণীয়
বাজারের এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিয়েছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি: মিউচুয়াল ফান্ড এবং পেনশন ফান্ডকে সক্রিয় করার জন্য নীতিগত সুবিধা প্রদান করতে হবে।
দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি বন্ধ: বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির আগে তাদের মৌলভিত্তি সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা বৃদ্ধি: বিএসইসির দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যেন আর্থিক কারসাজি দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।
বিনিয়োগ শিক্ষার প্রচার: ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিনিয়োগ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে।
স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন: বাজারের সংকট চিহ্নিত করার জন্য একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নীতিমালা, এবং আস্থার সংকট বাজারকে পিছিয়ে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ ও হতাশা থেকে উত্তরণের জন্য বাজার সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাজারে আস্থা ফেরানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
