নিউজ ডেস্ক:
শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাঙালির সবচেয়ে বড় ও কার্যকর ফিল্টার।’ কারো নীতি-আদর্শ পরখ করতে হলে এরচেয়ে উপযুক্ত ফিল্টার আর সত্যিই নাই। বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য নেই যাদের, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করেনা যারা, তারা এই ফিল্টারে আটকাবেই।
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে যারা ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করেছে, ৬-৮ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে, দেড় কোটি মানুষকে শরণার্থী বানিয়েছে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী সকল অপরাধ সংঘটিত করেছে, সেই রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী হিসেবে পাকিস্তান সরকারের অধীনে কাজ করেছিল যে জামায়াত ও ছাত্রসংঘ (নাম বদলে বর্তমানে ছাত্রশিবির) তারা ‘মুক্তিযুদ্ধ ফিল্টারে’ আটকা পড়েছে সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়েই। তখন থেকেই বাংলার মানুষের কাছে তারা চিহ্নিত। সংগঠনের নেতা কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আযমসহ অন্যরা পালিয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে ৭৫-এ সপরিবারে হত্যা করা পর্যন্ত।
সেই জামায়াত-শিবির আজ আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা বলয়ের কাছাকাছি রয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিব্যক্তি তারা ঠিকই টের পাচ্ছে। দেশে এখনো হাজার হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের ভুক্তভোগী সদস্য বেঁচে আছেন। তারা এই রাজাকার ও দোসরদের চেনে। আর এই ‘মুক্তিযুদ্ধ ফিল্টার’ থেকে রেহাই পেতে নতুন ‘ন্যারেটিভ’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াত-শিবির।
মুক্তিযুদ্ধের সকল অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় যেখানে তাদের নেতাদের সাজা হয়েছে, এখন আবার নতুন করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলছেন,- মুক্তিযুদ্ধের অপরাধগুলো ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’ হলেই কেবল তার দায় স্বীকার করে নেবে জামায়াত।
তিনি জানান, তারা স্বীকার করেন যে তার দল ‘এক পাকিস্তানের পক্ষে’ ছিল এবং দলের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে ‘অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত’ থাকতে পারেন। তবে এর জন্য সাংগঠনিকভাবে জামায়াতকে দায়ী করা যাবে না।
দেশের একটি প্রধান গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান আরও বলেন, আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, ওই সময়ের আমি সাক্ষী থাকি আর না থাকি, এটা জামায়াতে ইসলামী না। যদি সন্দেহাতীতভাবে এ ধরনের কোনো ভুল বা অপরাধ প্রমাণিত হয়, আমি দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমা চাইব জাতির কাছে। আমার কোনো রিজার্ভেশন নেই এ ব্যাপারে। কিন্তু কোনো গোঁজামিল বা মিথ্যা চাপিয়ে দেওয়া হবে, আমি মিথ্যাকে সত্য বলব, এটা আমার পক্ষে সম্ভব না। আগে স্পষ্ট হতে হবে, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা।
একাত্তরে জামায়াত ও এর ছাত্রসংগঠন ছাত্র সংঘের নেতৃত্বে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের মতো সংগঠনগুলো গঠিত হয়েছিল, বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে এর উল্লেখ রয়েছে- এমনটা স্মরণ করিয়ে দিলে জামায়াতের আমির বলেন, একটা কথা আছে, ইতিহাস বিজয়ীদের পক্ষে আর পরাজিতদের বিপক্ষে থাকে। বাংলাদেশে, পূর্ব পাকিস্তানে তখন যারা ছিল, যারা ভালো মনে করেছে, সরকারের ডাকে সাড়া দিয়েছে। এটাকে দলের দায়বদ্ধতা বলা যাবে না, এটা ব্যক্তিদের যার যার দায়বদ্ধতা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বা পূর্ব পাকিস্তান জামায়াত ইসলামীর কোনো রেজ্যুলুশনের মাধ্যমে যদি এরকম (মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী) কোনো দল গঠন হয়ে থাকে, আর সেই রেজ্যুলুশনের ডকুমেন্ট যদি আওয়ামী লীগের কাছে যায়, সেটা অবশ্যই জাতি গ্রহণ করবে, আমিও গ্রহণ করব।
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতের আমির ছিলেন গোলাম আযম, তিনি বিভিন্ন জায়গায় ভাষণ দিয়ে বলেছেন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিতে, রাজাকার সম্মেলন বা বিভিন্ন জায়গায় জামায়াতের কর্মীদের পাকিস্তানের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান নিতে বলেছেন… এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, আমি এটা বলেছি আগেই, তারা এক পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। আমি তো বলিনি, তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে চলে গিয়েছিলেন। তারা যেহেতু এক পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, সুতরাং দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, স্থিতিশীলতার জন্য যেটা দরকার বলেছেন। তারা তো অস্বীকার করেনি তারা এক পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, সহিংসতা যদি কেউ করে থাকে, স্বয়ং গোলাম আযম করে থাকলেও তার বিচার হোক। আমার কোনো আপত্তি নেই।
প্রসঙ্গত, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘রিসেট বাটন’ পুশ করার মাধ্যমে ইতিহাস তথা একাত্তরের চেতান বিলোপ করার যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে, তারই অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জামায়াত নেতা ও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করা তাজুল ইসলামকে। যার মাধ্যমে এখন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির বিচার করে তাদের সাজা প্রদানের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতি নিয়েছে জামায়াত। যার প্রেক্ষিতে রাজাকার সাঈদীর পুত্র মাসুদ ইতিমধ্যে হুমকি দিয়েছে ‘খেলা হবে’ বলে।
