“থাপ্পড় কান্ড” শিশু বলৎকারের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করছে সমাজকেঃ বিভিন্নস্থানে মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জনতার আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া

“থাপ্পড় কান্ড” শিশু বলৎকারের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করছে সমাজকেঃ বিভিন্নস্থানে মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জনতার আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৪ অক্টোবর ২০২৬


গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছরের এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষকে থাপ্পড় দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত কয়েক দিনে গাজীপুর, কুষ্টিয়া ও পাবনায় মাদ্রাসার শিক্ষক বা পরিচালকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে। কোথাও কোথাও ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তকে মারধর করেছে, কোথাও মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে।

 

টঙ্গী: থাপ্পড়ের ভিডিও ও পাল্টাপাল্টি মামলা

গত বুধবার টঙ্গীর আউচপাড়ার একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (৭) যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। শিশুটির পরিবারের ভাষ্য, ঘটনার পর কাউকে কিছু জানালে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এতে শিশুটি কয়েক দিন মাদ্রাসায় যেতে চায়নি।

বিষয়টি জানার পর পরিবার ও স্থানীয়রা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্তের কাছে জবাব চান। এ সময় উত্তেজিত লোকজন তাঁকে মারধর করেন। থাপ্পড় মারার ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ তাঁকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে। টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফ হোসেন জানান, প্রাথমিক তদন্তে যৌন হয়রানির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযুক্তকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠান।

অন্যদিকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ শিশুটির অভিভাবকদের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর এবং টাকা ও মুঠোফোন লুটের পাল্টা অভিযোগ করেছে। ওসি জানিয়েছেন, ওই মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

 

গাছা, কুষ্টিয়া ও পাবনায় একই ধরনের অভিযোগ

  • গাজীপুরের গাছা: একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির আট বছরের এক ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক অলিউল্লাহ ইসলাম ও মাদ্রাসার পরিচালক মোহাম্মদ মিজানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। এজাহারে বলা হয়েছে, ১০ থেকে ১২ অক্টোবর রাতে শিশুটিকে স্টোররুমে নিয়ে একাধিকবার নির্যাতন করা হয়।
  • কুষ্টিয়ার দৌলতপুর: ৯ বছরের এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক সাঈদ হোসেন ওরফে নান্নুকে (৪২) কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানায়, ঘটনা স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা চলছিল। তা জেনে পুলিশ পরিবারের সঙ্গে কথা বলে মামলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর আগে ৮ অক্টোবর একই উপজেলার আরেক মাদ্রাসায় ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষককে আটক করতে গিয়ে ক্ষুব্ধ জনতার হামলায় ওসিসহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হন।
  • পাবনা সদর: ভাঁড়ারা ইউনিয়নের নুরে মদিনা আবাসিক মহিলা মাদ্রাসার পরিচালক আবু ইউসুফের বিরুদ্ধে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীর বয়স আলাদা এসেছে, তদন্তে তা স্পষ্ট হবে। পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয়রা তাঁকে আটক করে পুলিশে দেন। পরদিন সকালে বিক্ষুব্ধ লোকজন মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও আগুন দেন। একটি সূত্র জানায়, অভিযুক্তের বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়েছে। শিশুটির চাচা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছেন। পুলিশ সুপার জানান, অভিযোগ ও অগ্নিসংযোগ—দুটির তদন্তই চলছে এবং এলাকায় পুলিশ মোতায়েন আছে।

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই চাপা পড়ে থাকার প্রবণতা দেখা গেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাদ্রাসায় অন্তত ২১১টি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি, কারণ বহু ঘটনা স্থানীয় সালিসে ধামাচাপা পড়ে যায়। প্রথম আলোর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনাকে ‘ধর্মের ওপর আক্রমণ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার ও সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেয়। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা চলছিল। পুলিশ তা জেনে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর মা বাদী হয়ে অভিযোগ করেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে টঙ্গী, গাছা, দৌলতপুর ও পাবনায় অল্প সময়ের মধ্যে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটায় অনেকে মনে করছেন, অভিভাবকদের মধ্যে অভিযোগ করার সাহস বাড়ছে। তবে এই প্রবণতার পেছনে টঙ্গীর থাপ্পড়ের ভিডিওর ভূমিকা প্রমাণিত নয়। কারণ কুষ্টিয়া ও গাছার অভিযোগ ওই ঘটনার আগেই থানায় পৌঁছেছিল। আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঝুঁকিও স্পষ্ট। টঙ্গীতে ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধেই পাল্টা মামলা হয়েছে, আর পাবনায় মাদ্রাসা ও অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা এখন তদন্তাধীন। বিশ্লেষকরা তাই বলছেন, সাহসের জায়গা হওয়া উচিত থানায় অভিযোগ করা ও আদালতে বিচার চাওয়া, জনতার হাতে শাস্তি দেওয়া নয়।

পুরোনো সংকট, আইনি পরিণতি বিরল

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে নতুন নয়। অভিযোগ ওঠার পর অনেক ঘটনা স্থানীয়ভাবে ‘মীমাংসা’ হয়ে যায়, সেটি কুষ্টিয়ার ঘটনাতেও দেখা গেছে। ২০১৯ সালে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের মামলা তুলে না নেওয়ায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। সেই মামলায় প্রথমে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। চলতি বছরের ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন, চারজনকে যাবজ্জীবন দিয়েছেন এবং ১০ জনকে খালাস দিয়েছেন।

সতর্কবার্তা: ক্ষোভ ন্যায্য, কিন্তু আইন হাতে তুলে নেওয়া নয়

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অভিযুক্তদের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতভেদ দেখা যাচ্ছে না। তবে গণপিটুনি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ আইনের বাইরের পথ। এতে অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই শাস্তি পেয়ে যান, কখনো সঠিক ব্যক্তি চিহ্নিত না হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তা ছাড়া মাদ্রাসা পুড়িয়ে দিলে অন্য শিশুদের পড়াশোনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টঙ্গীতে পাল্টা মামলাও দেখাচ্ছে, উত্তেজনার মধ্যে ভুক্তভোগী পরিবার নিজেই আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।

প্রতিটি অভিযোগ আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ। সব মাদ্রাসাশিক্ষককে এক কাতারে ফেলাও ঠিক নয়। তবে অভিযোগ যেখানে উঠছে, সেখানে দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগী শিশুর সুরক্ষা ও স্বচ্ছ বিচার না হলে এই ক্ষোভ ও সহিংসতা বাড়তেই থাকবে।

 

Visited 2 times, 2 visit(s) today