জুলাইতে এমদাদ হত্যামামলার আসামি শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা, বাদীকে চেনেন না মা: “আমার ছেলে মরেও গালি শুনছে”

জুলাইতে এমদাদ হত্যামামলার আসামি শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা, বাদীকে চেনেন না মা: “আমার ছেলে মরেও গালি শুনছে”
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


২০২৪ সালের জুলাই সংঘাতের সময় ঢাকার বাড্ডায় নিহত প্রাইভেটকারচালক এমদাদুল হক হত্যা মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তবে আসামিদের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নিহতের পরিবার। মামলার বাদীকে চেনেনও তারা। তার উদ্দেশ্য নিয়েও তুলেছেন প্রশ্ন।

পরিবারের ভাষ্য, এমদাদের আত্মীয় না হয়েও বাদী সাইফুল ইসলাম মামলাটি করে এলাকার কয়েকজনকে ফাঁসিয়েছেন।

মামলার বাদী সাইফুল নিজেকে এমদাদের চাচাতো ভাই বলে পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু এমদাদের মা মোসাম্মৎ হাসিনা বেগম জানান, মামলা হওয়ার আগে তারা সাইফুলকে চিনতেনও না।

এজাহারে শেখ হাসিনাসহ ১২১ জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন সাইফুল। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।

তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের অপারেশন শাখা—বারিধারার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। অভিযোগপত্রে এজাহারে নাম থাকা ৭৭ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এমদাদ ও সাইফুল—দুজনেরই বাড়ি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানার ধাওয়া গ্রামে। তবে মামলা করার আগে সাইফুল এমদাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি বলে নিশ্চিত করেছেন হাসিনা বেগম।

তিনি বলেন, “আমরা কোনো মামলা করিনি। পরে জানতে পারছি মামলা করছে পাশের এলাকার একজন। তাকে চিনতামও না। মামলা করার আগে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। মামলার করে তারপর যোগাযোগ করছে।”

সাইফুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে হাসিনা বেগম বলেন, “মামলায় এলাকার কিছু লোককে ফাঁসায় দিছে। তারা থাকে গ্রামে। আর মামলা করে ঢাকায়। তারা ঘটনার সময়ও (আন্দোলনের সময়) এলাকায় ছিল। ইচ্ছা করে লোকগুলোকে ফাঁসায়ে দিছে। তার সাথে হয়ত শত্রুতা ছিল, এজন্য এমন করছে।”

এ বিষয়ে সাইফুল প্রতিবেদককে বলেন, মামলার বিষয়ে “সাক্ষাতে কথা বলব”। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

ঘটনার পরিক্রমা

২০২৪ সালের ২০শে জুলাই, জুলাই সংঘাতের সময় রাজধানীর বাড্ডায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির গুলিতে নিহত হন এমদাদ। এ ঘটনায় ৯ই সেপ্টেম্বর মামলা করেন সাইফুল। তদন্ত শেষে অক্টোবরের প্রথমার্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “অভিযোগপত্র আদালতে জমা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের আসামি করা হয়েছে। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এরপরের বিষয় আদালত দেখবেন।”

শেখ হাসিনা ছাড়াও অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আসাদুজ্জামান নূর, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও জুনাইদ আহমেদ পলককে। শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামও আসামির তালিকায় রয়েছেন।

এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, মোহাম্মদ ওয়াকিল উদ্দিন ও হেদায়ত উল্লাহ রণ এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের নামও রয়েছে আসামির তালিকায়।

অন্যদিকে, সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতউল্যাহ, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, পুলিশের বিশেষ শাখার সাবেক কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, ওয়াসিকুর রহমান বাবু এবং কামাল উদ্দীন শাহীনের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

আসামিদের মধ্যে সালমান এফ রহমান, পলক, আতিকুল ইসলাম ও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন কারাগারে রয়েছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, “শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাদ্দাম হোসেনসহ কয়েকজন নির্দেশদাতা আসামি। তারা ঘটনাস্থল বাড্ডার এ এম জেড হাসপাতালের একটু সামনে রাস্তায় উপস্থিত না থাকলেও তাদের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি বর্ষণ করা হয়। এমদাদের কপালে গুলি লেগে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায় এবং সে মারা যায়।”

বাদীর বিরুদ্ধে অভিযোগে ক্ষুব্ধ নিহতের পরিবার

মোসাম্মৎ হাসিনা বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে এমদাদ ছিলেন সবার ছোট। ঢাকায় তিনি প্রাইভেটকার চালাতেন। মৃত্যুর আগের রাতেও মায়ের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। পরদিন সকালে ছেলের মৃত্যুর খবর পান হাসিনা বেগম।

তিনি বলেন, “মামলা করে কী করব? ছেলে কি ফিরে আসবে? কার নির্দেশে খুন হয়ছে, জানি না। আমার বুক খালি করছে। এরকম কত মায়ের বুক খালি হয়েছে। আল্লাহর কাছে বিচার দিছি।”

হাসিনা বেগম আরও বলেন, “ছেলেটা মারা যাওয়ার আগের দিন রাত ১০টায় ফোন দিয়ে কথা বললো। পরদিন সাড়ে ৯টার দিকে মৃত্যুর খবর পাই। সন্তান হারানো যে কত বেদনার, যে মা হারায় সেই বোঝে।”

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যে মামলা করছে, তার কারণে আমার ছেলেটা মরেও গালি শুনছে। যাদেরকে মামলায় ফাঁসাইছে, তারা এসে বলছে, আপনার ছেলের কারণে আমরা শুধু শুধু ঝামেলায় পড়েছি। আমি চাই, কোনো মা যেন আমার মত কষ্ট না পায়।”

Visited 5 times, 5 visit(s) today