বিশেষ প্রতিবেদক | ২৪ অক্টোবর ২০২৬
জুলাই সংঘাতের সময় হত্যা ও হামলার ঘটনায় সারা দেশে যত মামলা হয়েছে, তার একটি বড় অংশ তদন্তে ভিত্তিহীন বা সাজানো প্রমাণিত হচ্ছে। কোথাও জীবিত মানুষকে মৃত দেখানো হয়েছে। কোথাও সড়ক দুর্ঘটনাকে আন্দোলনে হামলা বলা হয়েছে। কোথাও নিহতের পরিবারের কেউ না হয়েও বাদী হয়ে গ্রামের মানুষকে আসামি করা হয়েছে। বিরোধ, জমি, মাদ্রাসার কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর চেষ্টাই এসব মামলার পেছনে বারবার উঠে আসছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে।
মা বললেন, বাদীকে চিনতেন না
২০২৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকার বাড্ডায় গুলিতে নিহত হন প্রাইভেটকার চালক এমদাদুল হক। এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনকে আসামি করে অক্টোবরের প্রথমার্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। মামলার বাদী সাইফুল ইসলাম এজাহারে শেখ হাসিনাসহ ১২১ জনের নাম দিয়েছিলেন। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করেছিলেন। তদন্তে ৭৭ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে এমদাদের পরিবারই মামলার বাদী ও আসামির তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এমদাদের মা হাসিনা বেগম জানান, মামলার আগে সাইফুলকে তাঁরা চিনতেন না, পরে তিনি যোগাযোগ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, গ্রামে থাকা কিছু মানুষকে শত্রুতার জেরে ‘ফাঁসিয়ে’ দেওয়া হয়েছে, অথচ ঘটনার সময় তাঁরা এলাকাতেই ছিলেন।
সাইফুল নিজেকে এমদাদের চাচাত ভাই বলে পরিচয় দেন। দুজনেরই বাড়ি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার একই গ্রামে। মামলা নিয়ে কথা বলতে চাইলে সাইফুল ফোনে ‘সাক্ষাতে’ কথা বলার কথা জানিয়ে লাইন কেটে দেন। মা বলেন, এই মামলার কারণে আসামিদের পরিবারের কাছে তাঁর ছেলে ‘মরেও গালি শুনছে’।
জুলাই গেজেট নিয়ে আরও পড়ুনঃ জুলাই গেজেট স্ক্যাম
আহত দাবির পেছনে সড়ক দুর্ঘটনা ও মাদ্রাসার বিরোধ
আজ বিডিনিউজ ও বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত আরেক ঘটনায় জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার দাবিতে করা মামলা পুলিশের তদন্তে সড়ক দুর্ঘটনা বলে বেরিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ জাফর আহমেদ নামে এক ব্যক্তি ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন। তাঁর দাবি ছিল, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় তিনি আহত হন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন অন্য কথা বলছে। তাতে বলা হয়েছে, ওই দিন সকালে বিজয় সরণি মোড়ে জাফর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। হাসপাতালের নথিতেও আন্দোলনের হামলায় আহত হওয়ার প্রমাণ মেলেনি। জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের গেজেটেও তাঁর নাম পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আসামিদের বড় অংশ ঘটনার দিন ঢাকাতেই ছিলেন না।
তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক আকরামুজ্জামান বলেন, এটি আসলে আন্দোলনে আহত হওয়ার মামলা ছিল না। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না পাওয়ায় অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার পেছনে ছিল মাদারীপুরের শিবচরে বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পারিবারিক ও প্রশাসনিক বিরোধ। সেখানে কর্তৃত্ব হারানোর পর জাফর প্রথমে মাদ্রাসার চারজনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও মানহানির মামলা করেন, যা আদালত খারিজ করে দেয়। এরপর তিনি জুলাইয়ের নামে নতুন মামলা করেন। এই মামলার ৪ নম্বর আসামি মাদ্রাসাশিক্ষক হেলাল উদ্দিন বলেন, তাঁদের থানা-আদালতে দৌড়াতে হয়েছে, টাকা খরচ করতে হয়েছে। জাফর আহমেদ বিডিনিউজকে নিজের আঘাতকে জুলাই আন্দোলনের বলে দাবি করেন এবং এ নিয়ে আর কথা না বলে ফোন কেটে দেন। মামলার পরবর্তী শুনানি ২ নভেম্বর।
জীবিতকে মৃত দেখানো
এ ধরনের ঘটনা একটি-দুটিতে সীমাবদ্ধ নয়। গত ডিসেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ঢাকার যাত্রাবাড়ীর একটি হত্যা মামলায় ‘নিহত’ বলা সোলায়মান সেলিম ওরফে দুলাল আসলে জীবিত। ডিবির তদন্তে উঠে আসে, মামলার বাদী তাঁর আপন ভাই মোস্তফা কামাল। তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি নিয়ে ভাইদের সঙ্গে সেলিমের শত্রুতা ছিল। সম্পত্তি দখল ও অর্থনৈতিক সুবিধার উদ্দেশ্যে বাদী জীবিত ভাইকে ‘গুলিতে নিহত’ দেখিয়ে মামলা করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মামলার অনুমতিও চেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মিরাজ খানের আইনজীবী বলেন, রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন এক মানুষ বিনা কারণে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে উত্তরায় ২০ বছর বয়সী এক যুবককে মৃত দেখিয়ে ২৫৭ জনকে আসামি করার মামলাও পাওয়া গেছে। সেই যুবক জীবিত এবং এ বছরের ২ জুন অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবিতে হত্যাচেষ্টার মামলায়ও তদন্তে মোটরসাইকেল-অটোরিকশা দুর্ঘটনার তথ্য মিলেছে। তদন্তে পুলিশ ধরে নিয়েছে, ওই মামলা রাজনৈতিক পাল্টা মামলা। ছেলের পরিবার এ প্রতিবেদনকে চ্যালেঞ্জ করবে বলে জানিয়েছে।
মামলার পেছনের উদ্দেশ্য:
তদন্ত সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব মামলার পেছনে একাধিক উদ্দেশ্যের কথা উঠে এসেছে।
প্রথমত, ‘মামলা বাণিজ্য’। একই ঘটনায় একাধিক মামলা এবং অজ্ঞাতনামা শত শত আসামির তালিকায় নাম ঢুকিয়ে পরে নাম কাটানোর আশ্বাসে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। জুলাইয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, এসব অভিযোগ তারা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত ও আর্থিক স্বার্থ। পিবিআই ও ডিবির তদন্তে ভুয়া মামলার পেছনে পূর্বশত্রুতা, জমি ও সম্পত্তির বিরোধ, পারিবারিক কলহ এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরে আহতদের তালিকায় ভুয়া দাবিতে অন্তত ২০০ জনকে চিহ্নিত করেছে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তাঁদের কেউ কেউ আর্থিক সহায়তাও নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তৃতীয়ত, নিহতের সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে সুক্ষভাবে জুলাইয়ে নিহতের সংখ্যা বড় করে দেখানো। শেখ হাসিনার আইনজীবীসহ সরকারের সমালোচকদের একাংশ অভিযোগ করছেন, নিহতের তালিকা বড় দেখিয়ে তৎকালীন সরকারকে দায়ী করার চেষ্টা ছিল।
প্রাথমিকভাবে দাবি করা ২০০০ এর উপর নিহতের ঘটনার ভিত্তিতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের ধারণাকৃত প্রায় ১৪০০ জন হত্যার এক ভিত্তিহীন সংখ্যা উত্থাপন করে। এবং এই হত্যা কান্ডের ঘটনাগুলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে আগস্টের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সময়কাল উল্লেখ করে। অথচ আগস্টের ৩ তারিখ থেকে শুরু করে সরকারী পক্ষ, পুলিশ ও আওয়ামীলীগের সদস্যদের উপর হামলা ও হত্যার খবর উঠে আসতে থাকে। আগস্টের ৪ তারিখ থেকে প্রতিদিন গড়ে সারা দেশব্যাপি শ’খানেক ব্যাক্তির নিহত হবার খবর পাওয়া যায়, যা ঘতিয়েছে জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা। আর এই সংখ্যা কোন প্রতিবেদনে আসে নাই।
বরং এদের অনেককেই সরকারি গেজেটে শহীদের সংখ্যা হিসাবে দেখিয়ে ৮৩৪ জন দিয়ে শুরু হয়ে পরে সংশোধিত হয়েছে, সূত্রভেদে এখন ৮৩৬ থেকে ৮৪৩। এর মধ্যেও কিছু নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে: প্রথম আলোর প্রতিবেদনে অন্তত ৫২ জনের নাম সরকারি সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে না বলে এসেছে এবং মন্ত্রণালয় আটজনের নাম বাদ দিয়েছে। অন্যদিকে সরকার ও জাতিসংঘের পক্ষের বক্তব্য, বহু মৃত্যু হাসপাতাল বা পুলিশের নথিতে না আসায় যাচাই কঠিন, তাই দুই সংখ্যায় ফারাক থাকা অস্বাভাবিক নয়।
এ সংক্রান্ত মার্ক রুবেন ও অচেনা একজনের দীর্ঘদিনের গবেষনায় প্রাপ্ত ফলাফলঃ জুলাই গ্যাজেট স্ক্যাম।
সংখ্যায় কী দেখা যাচ্ছে
- পিবিআই সারা দেশের আদালতে হওয়া ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্ত করছে। মে মাসের হিসাবে ১১৩টির তদন্ত শেষ হয়েছে। তাতে অন্তত ১৪টি মামলা ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। এর ১০টি হত্যাচেষ্টা, তিনটি হামলা-নির্যাতন ও একটি হত্যার অভিযোগে করা। আরও ১০টি মামলায় অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।
- তদন্ত শেষ হওয়া ১১৩টির মধ্যে ৮৯টি মামলার সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু সেগুলোতে ৬ হাজার ৮৪৪ জনকে আসামি করা হলেও প্রমাণ মিলেছে মাত্র ১ হাজার ৩৪৩ জনের বিরুদ্ধে।
- এপ্রিলে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহত-আহতের পরিবারের বাইরের ব্যক্তিরা ভিন্ন স্থান ও বর্ণনা দিয়ে বাদী হওয়ায় তিনটি মামলায় ৪৯৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
- জুলাইয়ে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০২ জন বাদীর বিরুদ্ধে উল্টো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ হয়েছে। কিছু মামলায় বাদী-আসামি কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
- পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত জুলাইয়ের ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৫৫টি।
‘মামলা বাণিজ্য’র অভিযোগ
সমস্যাটি নতুন নয়। ২০২৫ সালের শুরুতে সিলেটের শতাধিক মামলায় ভুয়া নামের অভিযোগ উঠেছিল। এক মামলার বাদী তখন জানান, তিনি মাত্র তিনজনের নাম দিয়েছিলেন, অথচ আসামি হয়েছেন ৫০ জন। জুলাইয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম ৫৯টি মামলার তদন্ত নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, একই ঘটনায় একাধিক মামলা ও ‘মামলা বাণিজ্যের’ অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনি ব্যবস্থা ও ক্ষতি
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ভুয়া মামলার আসামিদের ক্ষতিপূরণ পুলিশ দিতে পারবে না। তবে ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আদালতে আবেদন করা হচ্ছে। এই ধারায় সাধারণ ক্ষেত্রে দুই বছর এবং গুরুতর অপরাধের মিথ্যা অভিযোগে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন একে ‘আইনি ব্যবস্থার চরম অপব্যবহার’ বলেছেন।
ফলে মিথ্যা মামলা শুধু আসামিদের হয়রানি করছে না। প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবারের বিচার চাওয়ার নৈতিক জোর এবং জুলাইয়ের প্রকৃত ঘটনার বিবরণও এতে প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনগুলো আদালতে চূড়ান্ত হওয়া পর্যন্ত বাদীদের অনেকে নিজেদের অবস্থানে অটল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আদালত।
