❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে এলপিজি বাজারে সংকট ও অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধি নিয়ে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, সরকারিভাবে গ্যাসের দাম নির্ধারণের পরও তা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এরই মধ্যে এলপিজি গ্যাস বোতলজাতকরণ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য-উপাত্ত দাখিল করে ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে জমা দিয়েছে।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে দেয়।
নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু এই দামে গ্রাহকেরা কোথাও গ্যাস কিনতে পারছেন না। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ টাকা ডেলিভারি চার্জ।
কিছু কিছু এলাকায় সিলিন্ডার সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে এলাকাবাসীকে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়েও ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এক মাসের ব্যবধানেই মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিতে পারে গ্যাস কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত নতুন দাম।
১৫ই অক্টোবর একাধিক গ্যাস বোতলজাতকারী কোম্পানি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দাখিল করে। সেই প্রস্তাবে স্টোরেজ ও বটলিং চার্জ, ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ, রিটেইলার চার্জসহ প্রতি কেজি গ্যাসের ব্যয়ের বিভিন্ন খাত উল্লেখ করে প্রতিটি খাতে প্রকৃত খরচ তুলে ধরা হয়।
মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বহিঃবাজারে মূল্যস্ফীতি, বটলিং প্ল্যান্টের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, সিকিউরিটি ডিউটি ও পণ্য সংরক্ষণ, ইউটিলিটি এবং লজিস্টিকস খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি।
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগসংক্রান্ত কারণের মধ্যে রয়েছে ঋণের জন্য ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি এবং ইকুইটির ওপর প্রত্যাশিত মুনাফা।
কোম্পানিগুলোর দাবি, দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে মূলধনী বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বজায় রাখতে ইকুইটির ওপর বার্ষিক ২০ শতাংশ রিটার্ন বিবেচনা করা অপরিহার্য।
ডিস্ট্রিবিউশন খাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পরিবহন খরচ, জ্বালানির মূল্য, গুদামভাড়া ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে বড় অঙ্কের মূলধনী বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
এলপিজি কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব খাতে আগে সরকার নির্ধারিত চার্জ ছিল কেজিপ্রতি ২৪.৬৬ টাকা। নতুন প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ৪৭ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কেজিপ্রতি ২২.৩৪ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য ২৬৮ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দাঁড়ায়।
ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে ৫৮০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের প্রস্তাবে জানানো হয়, সরকার নির্ধারিত খরচ ১২ কেজির সিলিন্ডারপ্রতি ২১২ টাকার বিপরীতে প্রকৃত খরচ ৪৭৮ টাকা। অর্থাৎ, নির্ধারিত খরচের তুলনায় ২৬৬ টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
পেট্রোম্যাক্স এলপিজি বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে ১২ কেজির এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ৬৫৬.৫২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দাখিল করেছে।
এলপিজি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ১৮ই অক্টোবর পাঠানো চিঠির সংযুক্তিতে বিভিন্ন খাতের প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার মূল্যের বিপরীতে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে নতুন মূল্য ২ হাজার ১৩৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত মূল্য কার্যকর হলে গ্রাহকের ব্যয় ৪ হাজার টাকা ছাড়ানোর আশঙ্কা
বর্তমানে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার একটি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারই বাজারে কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।
অভিযোগ রয়েছে, সিলিন্ডার সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে গ্রাহকদের নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এলপিজি অ্যাসোসিয়েশনের প্রস্তাবিত ২ হাজার ১৩৭ টাকা মূল্য কার্যকর হলে বাজারে সিলিন্ডারের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যমান অতিরিক্ত মূল্য আদায় ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকলে প্রস্তাবিত মূল্যকে ভিত্তি করে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের ৪ হাজার টাকারও বেশি ব্যয় করতে হতে পারে।
ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনার আগে বাজারে সরবরাহব্যবস্থা, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণ এবং সিন্ডিকেটের অভিযোগ তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের রান্নার জ্বালানির ব্যয় আরও বাড়বে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
