❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই—এমন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বর্তমানে ৩৭টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ। এর মধ্যে পাঁচটি বন্ধ হয়েছে চলতি বছরেই। সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের দামও সম্প্রতি ৯ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসা বন্ধ থাকার পরও এসব শেয়ারে লেনদেন ও দরবৃদ্ধি কেন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেখা দিয়েছে শঙ্কাও।
ডিএসইর তথ্য বলছে, ২০১৬ সাল থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৬টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। ২০০২ সাল থেকে বন্ধ থাকা মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজকে এর সঙ্গে যোগ করলে বর্তমানে বন্ধ কোম্পানির সংখ্যা হয় ৩৭। অর্থাৎ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকলেও মেঘনা পেট এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
চলতি বছর বন্ধ কোম্পানির তালিকায় নতুন করে এসেছে অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, ফু-ওয়াং ফুড ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস। কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে যথাক্রমে ২৫শে জুন, ৯ই জুলাই, ১লা আগস্ট, ২২শে আগস্ট ও ৪ঠা অক্টোবর।
তালিকাভুক্তির সময় বিবেচনায় এ পাঁচটির মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো ফু-ওয়াং ফুড। কোম্পানিটি ২০০০ সালের জুলাইয়ে পুঁজিবাজারে আসে। এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস তালিকাভুক্ত হয় ২০০৬ সালে, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস ২০১০ সালে, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক ২০১৪ সালে এবং সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস ২০১৫ সালে।
অর্থাৎ চলতি বছর কার্যক্রম বন্ধ হওয়া পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে চারটিই অন্তত এক দশক ধরে তালিকাভুক্ত।
বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর একের পর এক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই একসময় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অর্থ তুলেছিল। পরে উদ্যোক্তাদের বিরোধ, আর্থিক অনিয়ম, ঋণখেলাপি, আইনি জটিলতা কিংবা ব্যবসা চালানোর সক্ষমতা হারানোর মতো নানা কারণে তারা সংকটে পড়ে।
উৎপাদনমুখী কয়েকটি কোম্পানি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও গ্যাসের সংকটেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার কোথাও ব্যাংকিং বিধিনিষেধ, কার্যকরী মূলধন ও কাঁচামালের ঘাটতি কিংবা উদ্যোক্তাদের বিরোধে কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে।
চলতি বছরের আগস্টে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস উৎপাদন বন্ধ করে। ব্যাংকিং বিধিনিষেধের সঙ্গে কাঁচামাল ও দক্ষ শ্রমিকের সংকটকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল কোম্পানিটি।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক দেশ ছাড়েন। এরপর ব্যাংক হিসাব জব্দ হলে কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদন উপকরণ সংগ্রহে সমস্যায় পড়ে কোম্পানিটি।
গত বছরের জুনে কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করে হামিদ ফেব্রিকস। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকাকে বন্ধের কারণ হিসেবে জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। এর আগের দুই বছর ধরেই গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শেষ পর্যন্ত উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ২২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। ‘রানি মার্কা’ ঢেউটিন উৎপাদনকারী কোম্পানিটির কার্যক্রম ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ।
তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। সাবেক পরিচালকদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছিল।
মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের কার্যক্রম সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ। ২০০২ সাল থেকে কোম্পানিটির ব্যবসা নেই। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন। ডিএসইর ওয়েবসাইটে কোম্পানিটির যোগাযোগের কোনো নম্বর কিংবা কোম্পানি সচিবের নাম দেওয়া হয়নি।
কিছু কোম্পানির অস্তিত্ব এখন কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) উৎপাদনের ভৌত সম্পদও হারিয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দেখা গেছে, কোম্পানিটির কারখানা ও অন্য সম্পদ এরই মধ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসও। ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৪৫ কোটি টাকা তোলে। কিন্তু তালিকাভুক্তির মাত্র দুই বছরের মাথায়, ২০১৭ সালের জুনে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
২০২১ সালে আলিফ গ্রুপ সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং এটিকে আবার উৎপাদনে ফেরানোর উদ্যোগ শুরু করে। ২০২২ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদনও শুরু হয়েছিল। তবে ডিএসইর সর্বশেষ পরিদর্শনে কারখানাটি আবার বন্ধ পাওয়া যায়।
উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি নিয়মিত আর্থিক তথ্য প্রকাশেও পিছিয়ে আছে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকের পর কোম্পানিটি আর কোনো প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন দেয়নি। নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে না পারায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডিএসই কোম্পানিটিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে নামিয়ে দেয়।
এর আগে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসকে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্যাংক, ঋণদাতা, শেয়ারহোল্ডার, উচ্চ আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে একীভূতকরণের কথা থাকলেও প্রক্রিয়াটি এখনো সম্পন্ন হয়নি।
ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকা কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের দর সম্প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে এসব শেয়ারে জল্পনানির্ভর লেনদেন কিংবা সম্ভাব্য কারসাজি নিয়ে বাজার-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত বছরের মে মাস থেকে বন্ধ আজিজ পাইপস। এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৩৬.৩ শতাংশ, অর্থাৎ ২৬ টাকা ৩০ পয়সা বেড়ে ৯৯ টাকা ৩০ পয়সায় পৌঁছেছে। গত মঙ্গলবার এক দিনেই শেয়ারটির দাম বাড়ে ৭.৪৭ শতাংশ।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দরও এক মাসে ২০.৭১ শতাংশ বা ১২ টাকা ৩০ পয়সা বেড়ে ৭১ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে।
ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের শেয়ারের দাম একই সময়ে বেড়েছে ২২ শতাংশ। আর ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে উৎপাদন বন্ধ শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ব্যবসা বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের এমন দরবৃদ্ধির সঙ্গে তাদের মৌলিক অবস্থার সামঞ্জস্য নেই। তাই এসব শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে জল্পনানির্ভর লেনদেন ও কারসাজির আশঙ্কা রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
ডিএসইর এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক কোম্পানি তাদের কার্যক্রমের প্রকৃত অবস্থা সময়মতো বিনিয়োগকারীদের জানায়নি। এ কারণে ডিএসই তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শন বাড়িয়েছে। কোম্পানিগুলোর বাস্তব অবস্থা যাচাই করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
তবে শুধু পরিদর্শন করে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ।
তার মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জকে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।
যেসব কোম্পানির ব্যবসায় ফিরে আসার বাস্তব সম্ভাবনা আছে, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা জমা দিতে হবে এবং অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে বলে মনে করেন আবু আহমেদ।
আর দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর কোম্পানিগুলোর আর্থিক ও আইনি পরিস্থিতি বিবেচনা করে আলাদা সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন স্থগিত করার পরিকল্পনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
তবে এই সিদ্ধান্ত কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
