জাইমা রহমানের জাতিসংঘে নিয়োগ নিয়ে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে খলিলুর রহমানের ভূমিকা

জাইমা রহমানের জাতিসংঘে নিয়োগ নিয়ে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে খলিলুর রহমানের ভূমিকা
শেয়ার করুন
বিশেষজ্ঞদের দাবি, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আচরণবিধি লঙ্ঘনের আশঙ্কা রয়েছে;
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিজের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি সভাপতির দপ্তর

-ডেভিড বার্গম্যান


জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের নিয়োগ নিয়ে স্বার্থের সংঘাত ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী খলিলুর রহমানের দপ্তরে প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের নিয়োগ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

গত ৯ অক্টোবর প্রকাশিত নেত্র নিউজের সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগটি জাতিসংঘের নিয়ম মেনে হয়েছে বলে সভাপতির দপ্তর দাবি করলেও জাইমা রহমানকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে খলিলুর রহমানের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দেয়নি দপ্তরটি।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের আশঙ্কা

নেত্র নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইন্টেগ্রিটি বিভাগের অধ্যাপক এলিজাবেথ ডেভিড-ব্যারেট বলেন, ঘটনাটি জাতিসংঘের সভাপতির আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে এবং এতে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতের আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমান তাঁর পদটি পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে। সেই প্রধানমন্ত্রীর মেয়েকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বার্থের সংঘাত তৈরি করেছে বলে মনে হতে পারে। এতে প্রধানমন্ত্রীর অনুগ্রহ পাওয়ার চেষ্টা কিংবা তাঁর নির্দেশে নিয়োগ দেওয়ার সন্দেহও তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও নিয়োগটিকে স্বার্থের সংঘাতের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, খলিলুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি—দুটি দায়িত্বেই রয়েছেন। অন্যদিকে, যাঁর মেয়ে নিয়োগ পেয়েছেন, সেই তারেক রহমানই তাঁকে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় নিয়োগ দিয়েছেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের এসব বক্তব্য অভিযোগ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত সম্পর্কে তাঁদের মূল্যায়ন। নিয়োগে দুর্নীতি বা অনিয়ম হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়নি।

নিয়োগে সভাপতির ভূমিকা কী ছিল?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তর জাইমা রহমানের নিয়োগের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে যে নিয়োগটি জাতিসংঘের নিয়ম মেনেই হয়েছে এবং খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এটি সম্পন্ন হয়েছিল।

দপ্তরের মুখপাত্র মেলিসা সামার্স বলেন, জাতিসংঘ সচিবালয়ের কোনো কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা সভাপতির নেই। তিনি জানান, খলিলুর রহমান ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং জাইমা রহমানের নিয়োগ হয় ১৫ জুলাই।

কিন্তু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, খলিলুর রহমান ২ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ, জাইমা রহমানের নিয়োগের প্রায় ছয় সপ্তাহ আগেই তিনি নির্বাচিত হন।

নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের নথির বরাত দিয়ে বলা হয়, নতুন নির্বাচিত সভাপতিরা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তাঁদের দপ্তরের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কাজ শুরু করতে পারেন। সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে সভাপতির দপ্তরের জন্য বরাদ্দ করা আটটি অস্থায়ী পদ নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের কথা উল্লেখ রয়েছে।

খলিলুর রহমান জাইমা রহমানকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রেখেছিলেন কি না, তা স্পষ্ট করতে সভাপতির দপ্তরের মুখপাত্রকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর আর কিছু যোগ করার নেই।

ফলে নিয়োগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা কার হাতে ছিল, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি নিয়োগের জন্য প্রার্থী নির্বাচন বা বাছাইয়ে কারা ভূমিকা রেখেছেন, সে প্রশ্নও অমীমাংসিত থেকে গেছে।

বছরে বেতন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাইমা রহমানের পদটি এক বছরের চুক্তিভিত্তিক। জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট থেকে অর্থায়ন করা এই পদে প্রারম্ভিক বার্ষিক বেতন প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরে তিনি আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নিয়োগটি জাতিসংঘের পি-৩ পর্যায়ের পেশাগত পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবসম্পদসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা সমমানের যোগ্যতা থাকলে পি-৩ পর্যায়ের পদের জন্য সাধারণত অন্তত পাঁচ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। স্নাতক ডিগ্রির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার মানদণ্ড সাত বছর।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জাইমা রহমান আইন বিষয়ে ডিগ্রিধারী এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বার-এ আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তবে নেত্র নিউজ তাঁর প্রকাশ্য পেশাগত জীবনবৃত্তান্তে ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত সময়ের কাজের তথ্য পেয়েছে, যা দুই বছরেরও কম সময়ের।

এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানে ১১ মাস পূর্ণকালীন এবং অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ মাস খণ্ডকালীন কাজের তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্স ভিত্তিতে আদালত-সংশ্লিষ্ট কাজের উল্লেখ আছে।

জাইমা রহমানের জাতিসংঘের জীবনীতে স্বাস্থ্য খাতে আইনগত পরামর্শ ও জনসংযোগের কাজ এবং ঢাকার আইন প্রতিষ্ঠান সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার কথাও রয়েছে। তবে এসব কাজের নির্দিষ্ট সময়কাল ও বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা যায়নি।

ওই আইন প্রতিষ্ঠান গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে তিনি সেখানে কখন এবং কত দিন কাজ করেছেন, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাইমা রহমানের প্রকাশ্য ও তারিখ-উল্লেখিত কর্ম-অভিজ্ঞতার তথ্য পি-৩ পদের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার মানদণ্ড পূরণ করে না। তবে তাঁর জীবনীতে উল্লেখিত অন্যান্য কাজের অভিজ্ঞতা যোগ করলে প্রয়োজনীয় সময় পূরণ হয় কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সরকারের দাবি, যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ

জাইমা রহমানের নিয়োগ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁর নিয়োগে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং নিজস্ব যোগ্যতার ভিত্তিতেই তিনি পদটি পেয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নজমুল হক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, জাতিসংঘের বিদ্যমান নিয়ম ও নিয়োগপ্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করেই জাইমা রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর দপ্তরের মুখপাত্র মাহদী আমিনও বলেন, জাইমা রহমান নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে পি-৩ পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জাইমা রহমানের পেশাগত পরিচিতি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এ নিয়োগে সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরের মুখপাত্র সামার্স বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে জাইমা রহমানের যোগ্যতা ও পদের শর্ত যাচাই করেছে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। তাঁর দাবি, নিয়োগটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া এবং জাতিসংঘের বিধিবিধান অনুযায়ী হয়েছে।

তবে পদটির বিস্তারিত শর্তাবলি বা টার্মস অব রেফারেন্স প্রকাশের অনুরোধে তিনি সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাইমা রহমানের কাছেও মন্তব্য চেয়ে ই-মেইল পাঠিয়েছিল নেত্র নিউজ; তবে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তিনি জবাব দেননি।

জাতিসংঘের আচরণবিধিতে কী বলা আছে?

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আচরণবিধিতে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও জাতিসংঘের স্বার্থের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে—এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে মনে হতে পারে, এমন কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

২০১৬ সালে সাধারণ পরিষদ এই আচরণবিধি গ্রহণ করে। নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক সভাপতি জন অ্যাশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠার পর সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিধিটি গৃহীত হয়েছিল।

খলিলুর রহমান ২ জুন সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জাতিসংঘের সনদ ও সভাপতির আচরণবিধি পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে চলার অঙ্গীকার করেছিলেন।

জাইমা রহমানের নিয়োগের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি তাই শুধু নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা কার হাতে ছিল, তা নয়; বরং প্রার্থী নির্বাচনে সভাপতির কোনো ভূমিকা ছিল কি না, প্রয়োজনীয় যোগ্যতার শর্ত কীভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না।

নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের সবগুলোর উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে নিয়োগটি জাতিসংঘের নিয়ম মেনে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দাবি এবং বিশেষজ্ঞদের উত্থাপিত স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা—দুই দিকই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।

Visited 5 times, 7 visit(s) today