❐ চট্টগ্রাম ব্যুরো
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘চ্যানেল টোয়েন্টিফোর’-এর আবাসিক সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও চট্টগ্রাম টেলিভিশন রিপোর্টার্স নেটওয়ার্কের (সিটিআরএন) প্রধান পরামর্শক কামাল পারভেজকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ওয়াকিল হোসেন বগার বিরুদ্ধে।
সংবাদ প্রকাশের জেরে এই সাংবাদিকের মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে বার্তা পাঠান বগা। তাকে নিয়ে ‘মিথ্যা নিউজ’ করা হচ্ছে অভিযোগ তুলে বগা হুমকি দিয়ে বলেন- ‘তোর বিচার করা হবে’।
এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ, গভীর উদ্বেগ এবং কঠোর নিন্দা জানিয়েছে চট্টগ্রামের শীর্ষ তিনটি সাংবাদিক সংগঠন—চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) এবং সিটিআরএন। পৃথক পৃথক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ এই ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব: প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ এক বিবৃতিতে বলেন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। ভয়ভীতি বা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশের পথ থেকে বিচ্যুত করা সম্ভব নয়।

অনতিবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে সন্ত্রাসী বগাসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে): সিইউজের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ ঘটনাটিকে “নজিরবিহীন” উল্লেখ করে বলেন, রাজনীতির ছায়াতলে এই অপরাধীকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হলে তা সাংবাদিক সমাজ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে।
পড়ুন: স্বেচ্ছাসেবক দলের চাঁদাবাজির কোন্দল: অন্ধ সবজি বিক্রেতার কিশোর পুত্রকে ভাতের টেবিল থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা
অবিলম্বে সন্ত্রাসী বগাকে আইনের আওতায় না আনলে এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না হলে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
সিটিআরএনের নেতৃবৃন্দ যৌথ বিবৃতিতে জানান, সাংবাদিকরা কোনো ব্যক্তিস্বার্থ নয়, বরং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। পুরো গণমাধ্যমকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এ অপকৌশল অবিলম্বে বন্ধ করে দোষীদের গ্রেপ্তার ও কামাল পারভেজের নিরাপত্তা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তারা।

অতীতেও কয়েকবার অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন বগা
গত বুধবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন বগা চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিককে হুমকি দেন।
কে এই ওয়াকিল হোসেন বগা?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। বর্তমানে তিনি ‘পলাতক’ রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, পাহাড় কাটা, জমি দখল ও পুলিশ বাহিনীর ওপর হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট ২৩টি মামলা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলে তিনি একাধিকবার অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন। কিন্তু বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্বপালনকারী ডা. শাহাদাত হোসেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই বগা। এমনকি তারেক রহমানের সাথেও বগার একাধিক ছবি রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
পড়ুন: তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সেচ্ছাসেবক দলের নেতা বগাকে ধরতে অভিযানে বাধা ডা. শাহাদাতের
সম্প্রতি পাহাড়তলী কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমান চৌধুরীকে অপহরণ করে মারধর, ওয়্যারলেস তালতলা এলাকায় আলোচিত কিশোর হৃদয় হত্যাকাণ্ড এবং জালালাবাদ এলাকায় ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবির মামলায় বগার নাম উঠে আসে।
তবে নগর ভবনে বগাকে ধরতে পুলিশি অভিযানে বাধার ঘটনায় গত বুধবার বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন দাবি করেছিলেন, বগা সন্ত্রাসী নয়। সে ১৬-১৭ বছর বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে ছিল এবং সে জুলাই যোদ্ধা।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম নগরে বর্তমানে ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। প্রতিটি দলে রয়েছেন ৫ থেকে ১৫ জন। নগরজুড়ে এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা অন্তত ১ হাজার ৪০০। পুলিশ বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয়ে ৬৪ ‘বড় ভাই’ আছেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বগার অধীনেও রয়েছে কয়েক শ কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসী। নগরের ওয়্যারলেস কলোনি ও সংলগ্ন ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। স্বেচ্ছাসেবক দলের সন্ত্রাসীরা প্রতি রাতে তোলে এসব চাঁদা। এই চাঁদা নিয়ে বিরোধের জেরে গত ২৯শে সেপ্টেম্বর খুন হয় এক সবজি বিক্রেতার পুত্র।
