৭ মাসে ৩২ গ্যাসকূপ খননের দাবি বিএনপি সরকারের: পেট্রোবাংলার ২০২৪ সালের নথিতে উন্মোচিত হলো সরকার-বাসাস’এর নির্জলা মিথ্যাচার

৭ মাসে ৩২ গ্যাসকূপ খননের দাবি বিএনপি সরকারের: পেট্রোবাংলার ২০২৪ সালের নথিতে উন্মোচিত হলো সরকার-বাসাস’এর নির্জলা মিথ্যাচার
শেয়ার করুন
বাসস-এর প্রতিবেদনে উল্লিখিত একাধিক কূপের খনন ও গ্যাস আবিষ্কার আগেই সম্পন্ন |
বিএনপি সরকারের সফলতা দাবিকৃত ১৪টি কূপ থেকে
২০২৪ সালেই দৈনিক ৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের তথ্য

 

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ৯ই অক্টোবর, ২০২৬।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত মাসে ৩২টি গ্যাসকূপ খনন করে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করেছে—রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) এমন দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পেট্রোবাংলার ২০২৪ সালের জুনের নথি এবং বিভিন্ন কূপের খননসংক্রান্ত পূর্ববর্তী তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, তালিকায় থাকা একাধিক কূপের খনন, গ্যাস আবিষ্কার কিংবা উৎপাদনের প্রস্তুতি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সম্পন্ন হয়েছিল।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাত মাসে দ্রুত গতিতে ৩২টি কূপের খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৮ অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস)

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাত মাসে দ্রুত গতিতে ৩২টি কূপের খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৮ অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস)

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নতুন গ্যাসকূপ খনন করে উৎপাদনে নেওয়া দীর্ঘ ও বহু ধাপের প্রক্রিয়া। সম্ভাব্য স্থান নির্বাচন, ভূতাত্ত্বিক ও ভূকম্পন জরিপ, সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন, যন্ত্রপাতি ও রিগ স্থাপন, খনন, পরীক্ষা এবং উৎপাদন শুরু—সব মিলিয়ে একটি নতুন কূপ প্রস্তুত করতে সাধারণত দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। তাঁদের মতে, ক্ষেত্রবিশেষে এক থেকে দেড় বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

এ কারণে কোনো সরকারের সাত মাসের অর্জন নির্ধারণ করতে শুধু কূপের সংখ্যা বা গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ দেখলে চলবে না; প্রতিটি কূপের খনন শুরুর তারিখ, কাজ শেষ হওয়ার সময় এবং উৎপাদনে যাওয়ার ইতিহাসও যাচাই করা প্রয়োজন।

 ২০২৬-এ দাবিকৃত ১৪টি কূপের খনন সম্পন্ন হয়েছিলো ২০২৪-এ

পেট্রোবাংলার ২০২৪ সালের জুনের প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২৩ ও ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বিএনপি’র দাবিকৃত ১৪টি কূপের খনন সম্পন্ন হয়েছিল। ওই সময় এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ও ৩৫ ব্যারল তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

১৪টি কূপের খনন সম্পন্ন হওয়ার তথ্য এবং সেগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ও ৩৫ ব্যারেল (সিলেট-১০) তেল এর প্রাপ্তি

১৪টি কূপের খনন সম্পন্ন হওয়ার তথ্য এবং সেগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ও ৩৫ ব্যারেল (সিলেট-১০) তেল এর প্রাপ্তি

কূপগুলোর মধ্যে ছিল ভোলা নর্থ-২, টবগী-১, ইলিশা-১, সিলেট-১০, শ্রীকাইল নর্থ-১, শরীয়তপুর-১, সুন্দলপুর-৩, তিতাস-২৪, তিতাস-১৪, বিয়ানীবাজার-১, কৈলাসটিলা-২, কৈলাসটিলা-৮, রশিদপুর-২ ও রশিদপুর-৫।

এর মধ্যে ভোলা নর্থ-২, টবগী-১, ইলিশা-১ ও সিলেট-১০ কূপ খননে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, তালিকার বাকি কূপগুলোর খননে বাপেক্সের নিজস্ব ড্রিলিং রিগ ব্যবহারের তথ্য দেওয়া হয়েছে।

পেট্রোবাংলার ২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবদনে সম্পন্ন হয়ে যাওয়া ১৪টি কূপকেই বিএনপি সরকারের ৭ মাসের সফলতা বলে দাবি করে ছে বাসস

পেট্রোবাংলার ২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবদনে সম্পন্ন হয়ে যাওয়া ১৪টি কূপকেই বিএনপি সরকারের ৭ মাসের সফলতা বলে দাবি করেছে বাসস

অর্থাৎ, এই ১৪টি কূপের খনন ও উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য ২০২৪ সালের নথিতেই ছিল। ফলে এগুলোর খননকে পরবর্তী কোনো সরকারের নতুন অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা কূপভিত্তিক সময়রেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ইলিশা-১, কৈলাসটিলা-৮, তিতাস-২৪: খনন প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৩ সালে

ইলিশা-১ কূপের ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের এপ্রিলেই গ্যাসের স্তর আবিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছিল বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। পেট্রোবাংলার নথিতেও কূপটির অনুসন্ধান ও গ্যাস আবিষ্কারের তথ্য থাকার কথা বলা হয়েছে। ফলে এই কূপের গ্যাস আবিষ্কারকে বর্তমান বিএনপি সরকারের সাত মাসের নতুন সাফল্য হিসেবে দাবি করা হলে তা সময়রেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না।

কৈলাসটিলা-৮ কূপের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ। কূপটির খনন শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি। একই বছরের ২৪ মে বাসসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, কূপটির খননকাজ শেষ হয়েছে এবং সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ২১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল।

২৮শে এপ্রিল ২০২৩ এ খনন সম্পন্ন শেষে ইলিশা-১ কূপের ড্রিল এন্ড টেস্ট

২৮শে এপ্রিল ২০২৩ এ খনন সম্পন্ন শেষে ইলিশা-১ কূপের ড্রিল এন্ড টেস্ট

অর্থাৎ, কৈলাসটিলা-৮-এর খনন শেষ হওয়ার তথ্য বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের আগেই রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল একইভাবে, বেগমগঞ্জ-৪ (পশ্চিম) কূপের খননকাজ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল। এ ক্ষেত্রেও প্রকল্পটির প্রাথমিক কাজ বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগেই শুরু হয়েছিল।

রিগ খনন, সেবা সংক্রান্ত মালামাল ও কারিগরি জনবল তিতাস-২৪ কুপ স্থাপনায় মোবিলাইজেশন কার্যক্রম ১১.০৪.২০২৩ তারিখে সফলভাবে রিগ আপ সম্পন্ন হয়।

রিগ খনন, সেবা সংক্রান্ত মালামাল ও কারিগরি জনবল তিতাস-২৪ কুপ স্থাপনায় মোবিলাইজেশন কার্যক্রম ১১.০৪.২০২৩ তারিখে সফলভাবে রিগ আপ সম্পন্ন হয়।

দেশীয় জ্বালানির উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ২০২২-২৪ সময়কালের মধ্যে পেট্রোবাংলা মোট ৪৬ টি অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এরই অংশ হিসেবে বাপেক্স এর তত্ত্বাবধানে বিজয়-১১ রিগ দ্বারা এসজিএফএল এর বিয়ানিবাজার কূপ এর সফল ওয়ার্ক ওভার সমাপ্ত পর রিগ খনন, সেবা সংক্রান্ত মালামাল ও কারিগরি জনবল তিতাস-২৪ কুপ স্থাপনায় মোবিলাইজেশন কার্যক্রম ১১.০৪.২০২৩ তারিখে সফলভাবে রিগ আপ সম্পন্ন হয়। ২০২৩ সালের মে-জুন থেকে ওয়ার্কওভার কাজ (Spudding) শুরু করা হয়েছিল। জুন ২০২৩ এর মধ্যে কূপ এর টেস্টিং কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়।

২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা ছিল

পেট্রোবাংলার ২০২৪ সালের প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে বাপেক্সের মাধ্যমে ২৩টি এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২৭টি কূপ খননের পরিকল্পনা ছিল বলে সরবরাহ করা তথ্য থেকে জানা যায়।

এই কর্মসূচির আওতায় কয়েকটির প্রাথমিক কাজও একই বছরে শুরু হয়। তিতাস-৩১, বাখরাবাদ-১১, শ্রীকাইল ডিপ-১ ও মোবারকপুর ডিপ-১ কূপের প্রাথমিক কাজ ২০২৪ সালে শুরু হয়েছিল বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বেগমগঞ্জ-৪ (পশ্চিম) কূপের খননকাজও তখন চলমান ছিল।

২০২৫–২০২৮ সালের জন্য আরও ১০০ কূপের পরিকল্পনা

পেট্রোবাংলার ২০২৪ সালের নথি ও বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ১০০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনার উল্লেখ রয়েছে বলে সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৯৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ১০০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা

২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ১০০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা

পরিকল্পিত কূপের সংখ্যা, বাস্তবে খনন সম্পন্ন হওয়া কূপের সংখ্যা এবং জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া গ্যাসের পরিমাণ এক নয়। একইভাবে, নতুন কূপ খনন এবং পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভারও সংখ্যাও পৃথক করে দেখানো হয় পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে।

কূপের সংখ্যা আর ক্রেডিটবাজী নয়, প্রয়োজন জনগনের গ্যাস সংকটের বাস্তব সমাধান

জ্বালানি খাতে নতুন গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই অর্জনের হিসাব নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রচার বা কেবল মোট সংখ্যার ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য নথি ও প্রকল্পের সময়রেখা অনুসরণ করা প্রয়োজন। এটি সকল সরকারের সময়ে একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু সময়েরেখার হিসাব নিকাশ না করে ২০২৩-২৪ এ খনন সম্পন্ন হওয়া কূপ আর গ্যাস উত্তোলনকে ২০২৬ এর সরকারের নামে চালিয়ে দেয়া ক্রেডিটবাজির রাজনীতি উদাহারণ।

আর একইসাথে, এটা অপতথ্য দিয়ে দেশের জনগনকে ধোঁকা দেয়ার সামিল। গ্যাস সংকটে যেখানে নাকাল দেশবাসী, সেখানে এই মিথ্যা তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করে নিজেদের ব্যার্থতা আড়াল করার চেষ্টা খুব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান বাসস এর প্রকাশিত সংবাদে।

 

 

Visited 48 times, 5 visit(s) today