– জামিল আক্তার
(সাবেক গবেষণা সহযোগী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়)
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকলাব হাসান মাহমুদ টুকু, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি থেকে শুরু করে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বারবার দাবি করছেন, আওয়ামী লীগের বিগত সাড়ে ১৫ বছরে নাকি একটি কূপও খনন করা হয়নি, গ্যাসের উৎপাদন নাকি একটুও বাড়ানো হয়নি!
অথচ পেট্রোবাংলা বা জ্বালানি বিভাগের নথিগুলো বলছে ভিন্ন কথা।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মোট ১৫৫টি কূপ খনন করেছে। এই সময়ের মধ্যেই আবিষ্কৃত হয়েছে ৬টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র: সুন্দলপুর, শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, ভোলা নর্থ, জাকিগঞ্জ এবং ইলিশা।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল মাত্র ১৭৪৪ এমএমসিএফডি। সেই সংকট কাটাতে শেখ হাসিনা সরকার তিনটি স্পষ্ট কৌশল নেয়: দেশীয় অনুসন্ধান জোরদার করা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা।
এর সুফল দেশবাসী পেয়েছে। কোভিড মহামারির ঠিক আগে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে দৈনিক প্রায় ২৭৫০ এমএমসিএফডি-তে পৌঁছায়। এর পাশাপাশি ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটানো হচ্ছিল। দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে ১০০০ এমএমসিএফডি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছিল।
শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো গঠনেও আমরা অভূতপূর্ব অগ্রগতি এনেছি। ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের কূপ খননের জন্য একটি রিগও সচল ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকার এসে একটি পুরোনো রিগ ওভারহোলিং করে সচল করি এবং আরও ৪টি নতুন অত্যাধুনিক রিগ সংগ্রহ করি।
একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ সম্পদের মানচিত্র তৈরিতে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। এর অংশ হিসেবে ৩১ হাজার ২৮ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক জরিপ এবং প্রায় ৬ হাজার ৯৮৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সিসমিক জরিপ সম্পন্ন করা হয়। বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর সমুদ্রাঞ্চলে পরিচালনা করা হয় ১২ হাজার ৬৪২ লাইন কিলোমিটারের মাল্টিক্লায়েন্ট ২ডি সার্ভে।
শুধু তাৎক্ষণিক সমাধান ছাড়াও পেট্রোবাংলা ভবিষ্যতের রূপরেখাও প্রস্তুত করেছিল। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কাজ পুরোদমে চলছিল, যেখান থেকে ২০২৫ সালের মধ্যেই ৬১৮ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
এছাড়া ২০২৮ সালের মধ্যে মোট ১০০টি কূপ খনন, ওয়ার্কওভার ও ডিপ ড্রিলিং পরিচালনা করে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৯৮৫ এমএমসিএফডি নতুন গ্যাস যুক্ত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলমান ছিল। প্রথম ৫০টি কূপের অধিকাংশেরই খনন শেষ হয়েছিল এবং তা থেকে গ্যাস সংযোগও শুরু হয়েছিল।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে সেই দূরদর্শী প্রকল্পগুলো বাতিল বা স্থবির করে দিয়েছে।
পেট্রোবাংলার অধীনে সম্পাদিত এই বিশাল কর্মযজ্ঞই প্রমাণ করে, জ্বালানি খাতে দেশকে স্বনির্ভর করতে শেখ হাসিনা সরকার কতটা পরিকল্পিত ও আন্তরিকভাবে কাজ করেছে।
অন্যদিকে বিএনপির ২০০১-২০০৬ মেয়াদের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল কুখ্যাত ‘নাইকো দুর্নীতি’, যার মাধ্যমে দেশকে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায়েও সেই দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে।
যাদের অতীত ইতিহাস দুর্নীতি ও লুটপাটে ভরা, তারা যখন আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও সাফল্যকে অস্বীকার করে দিনরাত মিথ্যাচার করে, তখন তা কেবল রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই স্পষ্ট করে তোলে।
মিথ্যা দিয়ে সত্যকে কখনো ঢেকে রাখা যায় না।
