বিদ্যুৎ খাতের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিতে বৈষম্য: দরিদ্রের চেয়ে অধিক সুবিধা ভোগ করছে ধনীরা

বিদ্যুৎ খাতের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিতে বৈষম্য: দরিদ্রের চেয়ে অধিক সুবিধা ভোগ করছে ধনীরা
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


বিদ্যুৎ ভর্তুকির বড় অংশই পাচ্ছে তুলনামূলক সচ্ছল পরিবার। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার মোট বিদ্যুৎ ভর্তুকির ৩৩ শতাংশ সুবিধা পেলেও সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবার পায় মাত্র ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে দরিদ্রদের তুলনায় ধনী পরিবারগুলো বিদ্যুৎ ভর্তুকির সুবিধা দ্বিগুণের বেশি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি ধীর। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ে। এর সঙ্গে নিত্যপণ্যের উচ্চ দাম মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও ক্রমে বাড়ছে।

২০১৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসে সরকারের ভর্তুকি ছিল ৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। এর ৭০ থেকে ৯০ শতাংশই ব্যয় হয় বিদ্যুৎ খাতে।

বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের ভর্তুকি হিসাব করলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত খরচ দাঁড়ায় ১৫ টাকা ১৬ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে সরকারের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ৪ টাকা ৫৩ পয়সা।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, আবাসিক গ্রাহকেরা মোট বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় ৭২ শতাংশ সুবিধা পায়। এর মধ্যে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার পায় ৩৩ শতাংশ, আর সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবার পায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ পরিবার মিলেও ভর্তুকির মাত্র ৩০ শতাংশের সুবিধা পায়।

তবে দরিদ্র পরিবারের আয়ের তুলনায় বিদ্যুৎ ভর্তুকির গুরুত্ব বেশি। বিদ্যুতের কম দামের প্রত্যক্ষ সুবিধা এবং ভর্তুকি পাওয়া বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের কম দামের পরোক্ষ সুবিধা মিলিয়ে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ সুবিধার মূল্য তাদের কর-পূর্ব আয়ের ১৮ দশমিক ১ শতাংশের সমান। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে তা মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

ভর্তুকি তুলে দিলে বাড়বে দারিদ্র্য

বিকল্প কোনো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না করে বিদ্যুৎ ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দিলে দারিদ্র্যের হার ২ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে আয়বৈষম্য পরিমাপের জিনি সহগ ১ দশমিক ৬ পয়েন্ট বাড়তে পারে।

তবে বড় ধরনের বিদ্যুৎ ভর্তুকি বাদ দিলে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হবে। এর পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৯ শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাংকের মতে, ভর্তুকি তুলে নেওয়ার ফলে সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ মানুষের অতিরিক্ত ব্যয় পুরোপুরি পুষিয়ে দিলেও সরকার জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে।

জ্বালানি খাতে সংস্কারের তাগিদ

শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি সক্ষমতা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও খাতটির ভিত্তি দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এর পেছনে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিক নীতিগত ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে সংস্থাটি।

দীর্ঘদিন বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল দেশীয় গ্যাস। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমেছে। একই সময়ে নতুন গ্যাসের অনুসন্ধান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হয়নি।

২০১৭ সালেও বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পুরো চাহিদা নিজস্ব উৎপাদন দিয়ে মেটাতে পারত। এখন মোট গ্যাসের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ মেটাতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ায় উৎপাদন সক্ষমতাও বেড়েছে। বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪৩ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। তবে জ্বালানি সরবরাহের সংকট ও সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ খাত এখনো চাপে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এ মুহূর্তে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন উন্নত করাই সবচেয়ে জরুরি।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর কিছুটা চাপ কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

দরিদ্রকে সহায়তা দিয়ে আবার করের চাপ

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, সরকারি কর ও সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষকে যে সুরক্ষা দেওয়ার কথা, বাস্তবে তা যথেষ্ট হচ্ছে না।

২০২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক দেখেছে, প্রত্যক্ষ কর ও বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমায়। এতে জিনি সহগ ৫২ দশমিক ৪ থেকে কমে ৫০ দশমিক ৭ হয়। দারিদ্র্যের হারও ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসে।

তবে পরোক্ষ কর সেই সুফলের বড় অংশ নষ্ট করে দেয়। পরোক্ষ করের প্রভাব বিবেচনায় নিলে জিনি সহগ বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ দশমিক ৪ এবং দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৬ শতাংশে উঠে যায়।

অর্থাৎ সরকার একদিকে দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে পরোক্ষ করের মাধ্যমে তাদের ওপর বাড়তি চাপও তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে, ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারের কাছ থেকে পাওয়া সুবিধার তুলনায় বেশি অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করছে।

Visited 2 times, 2 visit(s) today