❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
এলপি গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে গ্রাহকদের ভোগান্তিতে ফেলার অভিযোগ উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনা এলপিজি এ কারসাজিতে জড়িত। সিন্ডিকেটের প্রভাবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় ১ হাজার টাকা বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকায় পৌঁছেছে।
জানা গেছে, এই পাঁচ কোম্পানি বিক্রেতাদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামের বাইরে অতিরিক্ত টাকা চাইছে। বাড়তি টাকা দিতে রাজি না হলে বিক্রেতাদের বলা হচ্ছে, গ্যাসের সরবরাহ নেই।
অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেট সদস্যরা সিলিন্ডারের আকারভেদে অন্যান্য এলপিজির দামও একই হারে বাড়িয়েছে। আমদানি ও মজুদের ধারা স্বাভাবিক থাকার পরও সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম প্রায় ১ হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের ক্ষোভ বাড়ছে।
‘কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের’ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
এর আগে মন্ত্রণালয় হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলে কিংবা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচ কোম্পানির সিন্ডিকেট এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে।
এদিকে, দুদিন আগেই সিঙ্গাপুর থেকে এলএনজির একটি নতুন কার্গো দেশে এসেছে। সেপ্টেম্বরেও বিভিন্ন উৎস থেকে একাধিক এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক প্রতিবেদনে পাঁচ কোম্পানির মজুদ নিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনা আমদানি করা এলপিজি বাজারে ছাড়েনি। স্বাভাবিক সরবরাহব্যবস্থায় পণ্য বাজারে না ছেড়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি মজুদ করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এর ফলে দেশের অনেক এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য গ্রাহকদের ২ হাজার টাকার বেশি দিতে হচ্ছে।
এনএসআইয়ের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। আমদানি করা এলপিজি বাজারে ছাড়া না হওয়ার অভিযোগ দ্রুত তদন্তের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
অক্টোবরে বাজারে প্রতি টনের মার্কেট প্রিমিয়াম প্রায় ৬৪ ডলার বেড়েছে—এ সময়ের সঙ্গে অভিযোগের মিল থাকায় বিষয়টি বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজি ইচ্ছাকৃতভাবে মজুদ রেখে দাম সমন্বয়ের পর বাজারে ছাড়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছে এনএসআই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা আমদানিকারকদের বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে পারে এবং বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। সরবরাহব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে থাকা অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাড়তি দামের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে উঠছে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচের বোঝা ভোক্তাদের ওপর পড়ছে।
এনএসআই ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে আমদানিকারকদের কাছে থাকা এলপিজির মজুদ জরুরি ভিত্তিতে নিরীক্ষার সুপারিশ করেছে। আমদানিকারকভিত্তিক চালান, খালাস, সংরক্ষণ, মজুদের পরিমাণ এবং পণ্য বাজারে ছাড়ার প্রকৃত তারিখ সংগ্রহ করতে বলেছে সংস্থাটি।
অক্টোবরে প্রিমিয়াম বাড়ার আগেই আমদানি করা এলপিজির কতটা দাম সমন্বয়ের পরও বাজারে ছাড়া হয়নি, সেটিও নির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বাড়তি প্রিমিয়াম বা বাজারদরের সুবিধা পাওয়ার আশায় কোনো আমদানিকারক কিংবা বাজারসংশ্লিষ্ট অন্য কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এলপিজি ছাড়তে দেরি করেছেন কি না, তা তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এনএসআই।
প্রতিবেদনে চিহ্নিত মজুদের পরিমাণ স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রয়োজন ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে।
বাজারে সরবরাহ সীমিত করা বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে কারও ভূমিকা প্রমাণিত হলে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে প্রতিবেদনে।
পর্যাপ্ত আমদানি করা এলপিজি যাতে বাজারে পাওয়া যায় এবং অতিরিক্ত মজুদের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট বা সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতেও সরকারকে তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, কৃত্রিম সংকটের অবসান ঘটাতে সদস্য কোম্পানি, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।
বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশে এলপিজি আমদানি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে এবং সেপ্টেম্বরে আমদানি করা পরিমাণ চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। তাই কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ নেই বলে তাদের বক্তব্য।
বিইআরসি নির্ধারিত দামের বেশি নিয়ে সিলিন্ডার বিক্রি বা অনুমোদনহীনভাবে গ্যাস মজুদ করা হলে অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার কিংবা খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সতর্ক করেছে লোয়াব।
ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।


