❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে ভয়াবহ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এর অক্টোবর সংস্করণে দেশের অর্থনীতি নিয়ে তাদের পূর্বের পূর্বাভাসে এসেছে পরিবর্তন।
‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৪ শতাংশে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৮ শতাংশ। বিনিয়োগ হ্রাসকে প্রবৃদ্ধি কমার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ ০.৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০.৭ শতাংশ কমেছে; রপ্তানিও হ্রাস পেয়েছে ৪.৮ শতাংশ।
গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারেনি। কোনো কোনো কারখানায় কাজের সময় কমানো হয়েছে, কোথাও উৎপাদন বন্ধ থেকেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইও হয়েছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ গ্যাসে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। এখন দেশের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস আমদানি করতে হয়।
অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমল তিন ধাপে
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালে ঘোষণা দিয়েছিল ২০২৫ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশের গৌরব অর্জন করবে; কিন্তু ২০২৪-এর রাজনৈতিক পালা বদল এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার পর বিএনপি সরকার এই লক্ষ্যমাত্রা পিছিয়ে নিয়ে গেছে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন এই যাত্রাকে সহজ বলে মনে করছে না।
গত ১৬ই জুন প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪.৬ শতাংশ। এরও আগে, ১৪ই জানুয়ারির প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৬.১ শতাংশ।
কিন্তু সংস্থাটির নতুন হিসাব বলছে, ১লা জুলাই শুরু হওয়া ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে যেতে পারে।
বিনিয়োগে স্থবিরতাকে প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী পূর্বাভাসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
পূর্বাভাসটি কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কায় প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার সময়কার হারকেও ছাড়িয়ে নিচে নেমেছে। ২০১৯–২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৪৫ শতাংশ, যা এখন পর্যন্ত দেশের সর্বনিম্ন।
এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩৪ সাল নাগাদ যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে বিএনপি সরকার, তা আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অথচ অর্থনীতিবিদদের প্রক্ষেপণ বলছে, ২০৩৪ সাল নাগাদ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে টানা ৮-৯ শতাংশে উন্নীত করতে হবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। অথচ দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি দেখে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা।
কাজ, শ্রমের মূল্য ও দারিদ্র্য
কাজ হারানোর পর অনেক নারী শ্রমবাজার থেকে সরে গেছেন। নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২২ সালের ৪২.৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে কমে ৩৮.৪ শতাংশ হয়েছে।
গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ থেকে কমে ৮.৭ শতাংশে এলেও পণ্যের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। কম আয়ের শ্রমিকদের মজুরি সেই দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার বেড়ে ১০.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ, এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। জাতীয় দারিদ্র্যের হারও ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২২.৫ শতাংশ হয়েছে।
ব্যাংক খাতে বাড়ছে ঝুঁকি
ব্যাংক খাতকে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
- খেলাপি ঋণ: খেলাপি ঋণের হার ২০.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৩.২ শতাংশ হয়েছে।
- ইসলামি ও সরকারি ব্যাংক: ইসলামি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮.৯ শতাংশ; সরকারি ব্যাংকগুলোতে তা ৪৩.২ শতাংশ।
- ব্যাংকের মূলধন: মূলধনের হার ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে নেমেছে, যেখানে ন্যূনতম হার থাকার কথা ১০ শতাংশ।
- দুর্বল ব্যাংক: দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ৭৬ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
- বেসরকারি ঋণ: বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৫ শতাংশ হয়েছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সরকারের আয়-ব্যয়
বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৩.৯ শতাংশ হয়েছে। সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১.৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংকঋণ থেকে। এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। কর আদায় লক্ষ্যমাত্রার ৮২.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এদিকে সরকারের চলতি ব্যয় বেড়েছে, আর উন্নয়ন ব্যয় কমেছে।
প্রবাসী আয় ১৭.৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫.৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। তবে একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৫ শতাংশ।
ভবিষ্যতের পূর্বাভাস
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.৪ শতাংশ। ২০২৭–২৮ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২২.৮ শতাংশে উঠতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ৮.৬ শতাংশ এবং ২০২৭–২৮ অর্থবছরে ৭.১ শতাংশ থাকতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ
১. ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা দ্রুত যাচাই করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
২. দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা।
৩. কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অপ্রয়োজনীয় করছাড় ধাপে ধাপে কমিয়ে সরকারের রাজস্ব বাড়ানো।
৪. সবার জন্য দেওয়া সাধারণ ভর্তুকি কমিয়ে দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো।
