ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধস: ‘সারা বিশ্ব বাংলাদেশে আসছে না’, বরং মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে

ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধস: ‘সারা বিশ্ব বাংলাদেশে আসছে না’, বরং মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে
শেয়ার করুন

 বিশেষ প্রতিবেদক

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র—এই দুই প্রধান বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য ধস দেখেছে। শুধু চাহিদা কমে যাওয়াই নয়, বরং একাধিক কাঠামোগত ও প্রতিযোগিতামূলক কারণে বাংলাদেশের বাজার অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি হারিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর বাজার

ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬.৪৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে।

বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) রপ্তানির পরিমাণ (ভলিউম) কমেছে ১০.৪৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৯.৪১ শতাংশ। বিশ্বের প্রধান পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে ইইউর বাজারে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে বাংলাদেশের—এই পতনের হার চীন, ভারত ও তুরস্কের তুলনায়ও বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজার

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৮.০৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩.২৫ বিলিয়ন ডলারে।

এ সময় পণ্যের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। একইসঙ্গে প্রতিযোগী দেশ কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে সরে যাওয়া ক্রয়াদেশের একটি অংশ নিজেদের দখলে নিয়ে বাজার অংশ বাড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের রপ্তানি পোষাকের বাজার হারানোর কারম নিম্নরুপ:

১. বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হওয়া

ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে পোশাকের চাহিদা কমেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং ভোক্তা আস্থা কমে যাওয়ার প্রভাবে খুচরা বিক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে।

ফলে বাংলাদেশসহ সব রপ্তানিকারক দেশেরই রপ্তানি আয় কমেছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চাহিদা সংকোচনের প্রভাব অন্যদের চেয়ে বেশি পড়েছে।

২. প্রতি ইউনিট পণ্যের দাম কমে যাওয়া

ইইউ বাজারে জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৯.৪১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রেও গড় ইউনিট মূল্য প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। ক্রেতারা কম দামে পণ্য চাইছে এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা মূল্য কমিয়ে অর্ডার ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

কিন্তু এই মূল্য হ্রাসের ফলে মোট রপ্তানি আয় আরও কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কম দামের চাপের কারণে অনেক কারখানা লাভজনকতা হারাচ্ছে।

৩. আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়া

ইইউ বাজারে: চীন, ভারত ও তুরস্কের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হার সবচেয়ে বেশি (১৬.৪৩%)। এই দেশগুলো দাম, ডেলিভারি সময় এবং পণ্য বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে: কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম বাংলাদেশ থেকে সরে যাওয়া অর্ডারগুলোর একটি বড় অংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে। এই দুই দেশ কম শ্রমমূল্য, দ্রুত ডেলিভারি এবং কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধার কারণে ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

৪. মূল্য প্রতিযোগিতা ও বাজার অংশ ধরে রাখার সক্ষমতায় দুর্বলতা

শুধু চাহিদা কমে যাওয়াই নয়—বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হার প্রতিযোগীদের চেয়ে অনেক বেশি। এতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে এবং বাজার অংশ ধরে রাখতে পারছে না।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং লজিস্টিকস জটিলতাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ইইউতে ১৬.৪৩% এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৮.০৮% রপ্তানি পতন শুধু অস্থায়ী চাহিদা সংকোচনের ফল নয়। এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, মূল্য নির্ধারণ কৌশল এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

আগামী মাসগুলোতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে আরও চাপ পড়তে পারে।

Visited 7 times, 1 visit(s) today