❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অপরাধ দমনে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশই একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে, কোথাও কোথাও প্রাণও হারিয়েছে।
বাউনিয়া বস্তি উচ্ছেদ অভিযান থেকে শুরু করে চাঁদাবাজির আস্তানায় অভিযান—প্রতিটি ঘটনাতেই পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের বেপরোয়া আচরণ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর বাউনিয়া এলাকায় সরকারি জমি উদ্ধারে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বস্তি ও দখলদারদের বাধার মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।
ওই ঘটনায় একাধিক পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজির একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল।
অন্যদিকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি এক ঘটনায় চাঁদাবাজ চক্রকে ধরতে গেলে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে পড়ে পুলিশ। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন বলে জানা যায়।
স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে ওই চক্রটি সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে গেলে তারা আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়।
ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাং, মাদকচক্র এবং চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যও বেড়েছে। অনেক জায়গায় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অপরাধীরা পালিয়ে গেলেও পরে সংঘবদ্ধভাবে আবার এলাকায় ফিরে আসে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, চাঁদা না দিলে দোকান ভাঙচুর, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে সেনাবাহিনী ব্যারাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে না ফিরলেও কোথাও অভিযান বা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে সেনাবাহিনীর কোন কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। এতে করে ২০২৪ এ আক্রান্ত হয়ে পুলিশের সক্ষমতা আর করৃত্ব খর্ব হয়ে যাওয়া কাটিয়ে না উঠতে পারা পুলিশ আরো অসহায় হয়ে পড়েছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, এখন যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটা শুধু অপরাধ বৃদ্ধি নয়, বরং অপরাধীদের মধ্যে একটি ধরনের ‘ইমিউনিটি ফিলিং’ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। ফলে তারা আরও সাহসী হয়ে উঠছে।
সাবেক একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, অনেক এলাকায় পুলিশ অভিযানে গেলে স্থানীয় প্রতিরোধের মুখে পড়ে। রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রগুলো অপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরেও মনোবল সংকটের কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মামলা, তদন্ত, রাজনৈতিক চাপ ও জনমতের প্রতিক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ প্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখাতে পারছে না। এর সুযোগ নিচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণেও দেখা যায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গণপিটুনি, মব সহিংসতা এবং সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
স্বরাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দ্রুত মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার আগামী দিনে বড় ধরনের সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।
