চট্টগ্রামে জেল বাণিজ্যঃ ‘টাকা দিলেই মুক্তি, না দিলেই শোন অ্যারেস্ট’; লেনদেন হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে

চট্টগ্রামে জেল বাণিজ্যঃ ‘টাকা দিলেই মুক্তি, না দিলেই শোন অ্যারেস্ট’; লেনদেন হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে
শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

​চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক এখন সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও মুক্তির আনন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ভয়ভীতি আর চাঁদাবাজির মুখে। জুলাই আন্দোলনের পর প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও জেল গেটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ‘টাকা আদায়ের মেশিনের’ দৌরাত্ম্য থামছে না।

 

​যেভাবে চলে এই বাণিজ্য

​অভিযোগ উঠেছে, সিটিএসবির কনস্টেবল মেরাজুল ইসলাম এবং ডিএসবির এএসআই মোহাম্মদ আল আমিন এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা। তাদের সাথে যোগসাজশ রয়েছে সিটিএসবির পরিদর্শক আব্দুর রহিমসহ কতিপয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। এই চক্রটি আদালত থেকে জামিন পাওয়া আসামিদের তালিকা সংগ্রহ করে তাদের স্বজনদের টার্গেট করে।
​জামিন পাওয়ার পর ‘থানা ক্লিয়ারেন্স’ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক মামলায় ‘তদন্তে প্রাপ্ত আসামি’ হিসেবে পুনরায় গ্রেফতার বা ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখানোর ভয় দেখানো হয়। এই ভয় থেকে বাঁচতে পরিবারের কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। টাকা দিলে মুক্তি মেলে, আর না দিলে কপালে জোটে নতুন মামলা।

 

​প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের জাল

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রে শুধু পুলিশ নয়, জড়িত আছে কতিপয় অসাধু আইনজীবী, জেল কর্মচারী, কথিত সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা। এমনকি কারাগারের বাইরের নির্দিষ্ট কিছু দোকানদারও এই তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোতোয়ালি, সদরঘাট ও চান্দগাঁও থানার কিছু ফরওয়ার্ডিং লেটার দেখিয়ে স্বজনদের জিম্মি করা হয়।

 

​আঙুল ফুলে কলাগাছ: লেনদেনে ক্রিপ্টোকারেন্সি

​অভিযুক্ত কনস্টেবল ও এএসআই পদমর্যাদার হয়েও ব্যবহার করছেন অত্যন্ত দামী স্মার্টফোন। অভিযোগ আছে, এই অবৈধ বাণিজ্যের টাকা ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে তারা সাধারণ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেয়ে বিকাশ, নগদ এবং বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন ও বিনিয়োগ করছেন। অভিযুক্তদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলোর ডিজিটাল ব্যাংকিং রেকর্ড যাচাই করলেই কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

 

​ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ

​ভুক্তভোগী রাজন খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আদালত জামিন দিলেও জেল গেটে এসে মনে হয় আবার জামিন নিতে হচ্ছে। টাকা দিলে জামিনের লিস্ট থেকে নাম সরিয়ে দ্রুত ছেড়ে দেওয়া হয়, আর না দিলে প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয়।”

​অপরদিকে, দীর্ঘ ১৭ মাস ধরে কারাবন্দি এক আসামির ভাগিনা সিফাত হোসাইন অভিযোগ করেন, সব মামলায় জামিন পাওয়ার পরও জেল সুপার ও জেলার উচ্চ আদালতের আদেশকে তোয়াক্কা না করে ডিসি অফিসের অনুমতির দোহাই দেন। এই টালবাহানার মাঝেই তার মামার নামে নতুন করে আরও একটি মামলা দেওয়া হয়েছে।

 

​জুলাই পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যেখানে পুলিশের সেবামূলক ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি গড়ার কথা, সেখানে চট্টগ্রাম জেল গেটের এই প্রকাশ্য চাঁদাবাজি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি করছে। কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার পকেট ভারী করতে গিয়ে পুরো বাহিনীর বদনাম হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

Visited 7 times, 1 visit(s) today