দেশের কারাগারগুলো সংশোধনাগারের নামে জীবন্ত নরক: অরাজকতার যাঁতাকলে পিষ্ট মানবাধিকার

দেশের কারাগারগুলো সংশোধনাগারের নামে জীবন্ত নরক: অরাজকতার যাঁতাকলে পিষ্ট মানবাধিকার
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


ব্রিটিশ আমলের অন্ধকার কুঠুরি বদলে আধুনিক অবকাঠামো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের কারাগারগুলোর ভেতরে বন্দিদের দীর্ঘশ্বাসে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাইরে থেকে ঝকঝকে মনে হলেও ভেতরের বাস্তবতা হলো— ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বন্দি আর ভয়াবহ অপুষ্টির কারণে দেশের কারাগারগুলো এখন এক মানবিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সারা দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা যেখানে মাত্র ৪৩ হাজার ১৫৭ জন, সেখানে বর্তমানে গাদাগাদি করে থাকছেন ৮৫ হাজারেরও বেশি মানুষ।

বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের চিত্র ভয়াবহ। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ১,৮৫৩ জনের জায়গায় থাকছেন ৬,১০৬ জন বন্দি, যা ধারণক্ষমতার সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। ঢাকার কেরানীগঞ্জেও একই চিত্র, ৪,৫৯০ জনের বিপরীতে বন্দি আছেন ১০ হাজারের ওপর।

এই বাড়তি চাপের কারণে বন্দিদের ঘুমানো, খাওয়া এমনকি টয়লেট ব্যবহারের মতো মৌলিক চাহিদাও এখন যুদ্ধের শামিল। অনেক জায়গায় বন্দিদের পালা করে বা শিফট অনুযায়ী ঘুমানোর মতো অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে।

সরকার বন্দিদের ডায়েট চার্ট আধুনিক করেছে। রুটি-গুড়ের বদলে এখন খিচুড়ি, সবজি-হালুয়া বা মাছ-মাংসের বরাদ্দ আছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, রান্নার নিম্নমান এবং পুষ্টিহীনতার কারণে বন্দিরা দিন দিন কঙ্কালসার হয়ে পড়ছে। হাজার হাজার মানুষের জন্য বড় কড়াইয়ে রান্নার ফলে নষ্ট হচ্ছে ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।

বন্দিদের ভাষায়, প্রোটিনের নামগন্ধহীন ‘পানির মতো পাতলা ডাল’ আর ‘ছোট টুকরোর নিম্নমানের মাছ-মাংস’ খেয়ে তারা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত বন্দিরা, যাদের ক্যান্টিন থেকে কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা চরম অপুষ্টির শিকার হয়ে চর্মরোগ, যক্ষ্মা এবং দীর্ঘস্থায়ী পেটের পীড়ায় ভুগছেন।

আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়া বন্দিদের দুপুরের খাবারের জন্য বরাদ্দ মাত্র ২৬ টাকা। বর্তমান বাজারদরে এই সামান্য টাকায় পেটভরে খাওয়া তো দূরের কথা, মানসম্মত খাবার কল্পনা করাও কঠিন। ফলে দীর্ঘক্ষণ অভুক্ত থেকে আদালত চত্বরে বন্দিরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপরাধবিরোধী অভিযানে ঢালাও গ্রেপ্তার এবং বিচারাধীন মামলার দীর্ঘসূত্রতাই কারাগারের এই বেহাল দশার মূল কারণ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কারাগারে কয়েদির চেয়ে হাজতি বা বিচারাধীন আসামির সংখ্যাই বেশি (প্রায় ৭৫%)। লঘু অপরাধে জামিন না হওয়া এবং জামিন অযোগ্য ধারার অপব্যবহার এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

কারা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বন্দি চাপ কমানো এবং পুষ্টির মান বাড়ানোর জন্য উচ্চপর্যায়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে সেই প্রস্তাব অনুমোদন হয়ে কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগারকে যদি প্রকৃত অর্থেই ‘সংশোধনাগার’ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে কেবল অবকাঠামো নয়, বন্দিদের মানবেতর জীবনযাপন ও পুষ্টির নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি। অন্যথায়, অপরাধী সংশোধনের বদলে এই ব্যবস্থা সুস্থ মানুষকেও দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Visited 7 times, 1 visit(s) today