❐ নিজস্ব সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার— এক সময় যা ব্রিটিশদের ত্রাস ছিল, আজ সেখানে রাজত্ব করছে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি আর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। অবকাঠামোগত কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হলেও, ভেতরের বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ১ হাজার ৮৫৩ জন বন্দির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই কারাগারে বর্তমানে গাদাগাদি করে থাকছেন ৬ হাজার ১০৬ জন। অর্থাৎ, ক্ষমতার চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি মানুষের চাপে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম সেখানে।
কারাগারের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, অতিরিক্ত বন্দির চাপে সাধারণ মৌলিক অধিকারগুলো সেখানে এখন আকাশকুসুম কল্পনা। ১ জনের থাকার জায়গায় থাকছেন ৩ থেকে ৪ জন। ঘুমানোর জায়গা নিয়ে চলছে নিরন্তর যুদ্ধ, অনেক সময় বন্দিদের পর্যায়ক্রমে বা ‘শিফটিং’ করে ঘুমাতে হচ্ছে। টয়লেট বা গোসলের মতো প্রাত্যহিক প্রয়োজন সারতে দিতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা।
এই তীব্র গরমে গাদাগাদি করে থাকার ফলে বন্দিদের মধ্যে চর্মরোগ, ছোঁয়াচে রোগ ও শ্বাসকষ্ট আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
কাগজে-কলমে বন্দিদের ডায়েট চার্টে মাছ, মাংস, ডাল আর সবজির কথা থাকলেও বাস্তবের থালায় মিলছে ভিন্ন কিছু। বড় কড়াইয়ে হাজার হাজার মানুষের রান্নার ফলে নষ্ট হচ্ছে খাবারের গুণাগুণ। অতিরিক্ত সেদ্ধ করা সবজি আর পানির মতো পাতলা ডাল খেয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন বন্দিরা।
বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা বন্দিরা, যাদের কারাগারের ক্যান্টিন (পিসি) থেকে অতিরিক্ত খাবার কেনার সামর্থ্য নেই, তারা চরম অপুষ্টির শিকার। তাদের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ আর শরীরে ভিটামিন ও জিংকের অভাবজনিত নানা রোগ এখন নিত্যনৈমিত্তিক।
চট্টগ্রাম কারাগারের এই উপচে পড়া ভিড়ের মূল কারণ হলো হাজতি বা বিচারাধীন আসামির আধিক্য। গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় জট বাড়ছে কারাগারের প্রকোষ্ঠে। লঘু অপরাধে বছরের পর বছর জামিন না পাওয়া কিংবা মামলার শুনানির দীর্ঘসূত্রতা কারাগারটিকে একটি মানবিক সংকটের গুদামে পরিণত করেছে।
আদালতে হাজিরা দিতে আসা বন্দিদের জন্য বরাদ্দ মাত্র ২৬ টাকা, যা দিয়ে চট্টগ্রামের বর্তমান বাজারে এক বেলা খাওয়া অসম্ভব। ফলে সারাদিন অভুক্ত বা আধা-পেটা খেয়ে হাজিরা দিয়ে পুনরায় কারাগারে ফেরার সময় তারা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছেন।
কর্তৃপক্ষ অবকাঠামো উন্নয়নের দোহাই দিলেও, বন্দিদের জীবনের এই মানবেতর অধ্যায় ঢাকা পড়ছে না কোনোভাবেই। চট্টগ্রাম কারাগার এখন সংশোধনাগার নয়, বরং এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার ভাগাড়।
